হোম > ফিচার

উত্তরের মায়াভরা পথে…

বন্যা নাসরিন

ঢাকার বাসিন্দা আমি। তবে ঢাকা থেকে সরাসরি চাঁপাইনবাবগঞ্জ না গিয়ে প্রথমে এক রাত থাকলাম রাজশাহীতে। পরদিন সকালে রাজশাহী রেলস্টেশন থেকে সকাল ৯টা ১০ মিনিটের চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী ‘রাজশাহী কমিউটার’ ট্রেন ধরলাম। ভাড়া নিল মাত্র ৫০ টাকা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপজেলা নাচোলে পৌঁছাতে সময় লাগল প্রায় দেড় ঘণ্টা। পথিমধ্যে বেশ কিছু স্টেশন দেখার সুযোগ হলো। খুব নিরিবিলি আর সাদামাটা সেসব স্টেশন। লোকাল ট্রেনে চড়ার অন্যতম সুন্দর অভিজ্ঞতা হলো, এমন ছোট ছোট অনেক স্টেশন দেখার সুযোগ মেলে, আর লোকাল ছাপোষা ধাঁচের মানুষদের সান্নিধ্য পাওয়া যায়। তাদের প্রত্যেকের জীবন যেন একেকটা অনবদ্য গল্প।

নাচোলে নেমে একটা অটো রিজার্ভ করলাম; গন্তব্য নেজামপুর ইউনিয়নের আলপনা গ্রাম টিকোইল আর কেন্দুয়া গ্রামের ইলা মিত্রের সংগ্রহশালা। যাওয়া-আসা ৫০০ টাকা। যেতে যেতে বুঝলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জে জনবসতি কম, ফসলের মাঠ বেশি। আর সেখানে মাটির বাড়ি অহরহ। জেলাটি যে খুব একটা উন্নত নয়, তা যে কেউ একবার গেলেই বুঝতে পারবে। আধুনিকতার এই শতাব্দীতে গ্রামগুলোও আধুনিক হয়ে গেছে। কেউ যদি প্রকৃত গ্রামের স্বাদ নিতে চায়, তাকে উত্তরের জেলাগুলোয় যেতে হবে।

মায়াঘেরা পথপ্রান্ত পেরিয়ে যেতে খুব ভালো লাগছিল। ৪০-৫০ মিনিট পর পৌঁছে গেলাম টিকোইল গ্রামে। এ গ্রামটি সম্পর্কে কয়েক বছর আগে সবাই জানতে পারে। তার পর থেকে এখানে সারা বছর দর্শনার্থীদের আনাগোনা লেগেই থাকে। আলপনা গ্রামের সব বাড়িতেই কমবেশি আলপনা আঁকা থাকে। তবে এখানকার ‘আলপনা বাড়ি’ নামে পরিচিত বাড়িটিতেই সাধারণত পর্যটকরা গিয়ে থাকেন। অটোওয়ালা আমাদের সেই বাড়িটির সামনে নিয়ে গিয়ে থামালেন। মুগ্ধ হয়ে বাড়িটি দেখলাম। ছোট পরিসরে হলেও, পুরো বাড়িটি আলপনার নান্দনিকতা দিয়ে ঘেরা। বাড়ির বাসিন্দারা কত যত্ন করে এসব আলপনা আঁকেন বছরজুড়ে, ভেবে অবাক হই। রোজ দর্শনার্থীরা ভিড় করলেও তারা বিরক্ত হন না; বরং হাসিমুখে বাড়িটি ঘুরে দেখার সুযোগ করে দেন। রঙে রঙে ঘেরা বাড়িটি দেখে যখন মুগ্ধতার আবেশ কাটছিল না, তখনই সেই বাড়ির একজন সদস্য জানালেন, কয়েক কিলোমিটার দূরেই ‘স্বপ্নের বাড়ি’ নামে আরেকটা আলপনা বাড়ি আছে, যে বাড়িটা নতুন করা হয়েছে এবং আয়তনে তা আরো বড়। কিন্তু আমাদের সময়স্বল্পতার কারণে সেই স্বপ্নের বাড়িটি এ যাত্রায় দেখতে পারিনি। পরে আবার কখনো দেখব, সেই ইচ্ছা পুষে রেখে রওনা হলাম পরবর্তী গন্তব্য ইলা মিত্রের সংগ্রহশালা দেখার জন্য।

সেখানে যেতেও পথেঘাটে একই চিত্র। জনবসতি নেই তেমন, শুধু বৈচিত্র্যময় ফসলের মাঠ। আমবাগান, বরই বাগান, সরষে ক্ষেত থেকে শুরু করে আরো কত কী! ধান কাটা হয়েছে কিছুদিন আগেই। সেই চিহ্ন ছড়িয়ে আছে মাঠজুড়ে। ইলা মিত্রের সংগ্রহশালায় যাওয়ার পথে বেশ কিছুটা পথ একটু এবড়োথেবড়ো, তাই যেতে সময় লাগে। তবে সেই বন্ধুর পথ পেরিয়ে যখন সেখানে পৌঁছাই, তখন এক আকাশ ভালোলাগা এসে জড়ো হয় চোখের পাতায়। কেন্দুয়া গ্রামের এ জায়গাটি ফসলের মাঠের ভেতরে, খোলামেলা জায়গায়; নয়নজুড়ানো রূপ তার। যখন সংগ্রহশালাটির চারপাশ সবুজ ধানে ভরা থাকে, কী যে অপূর্ব লাগে! আমরা সেই রূপ দেখতে না পেলেও যা দেখতে পেয়েছি, সেটাও কম কিছু নয়।

সংগ্রহশালার গল্প বলার আগে ইলা মিত্রের কথা কিছুটা না বললেই নয়। ইলা মিত্রের জন্ম ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায়। কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে তিনি ১৯৪৪ সালে স্নাতক পরীক্ষায় বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৫ সালে তার বিয়ে হয় দেশকর্মী কমিউনিস্ট রমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে। তিনি মালদহের নবাবগঞ্জ থানার (বর্তমান বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা) রামচন্দ্রপুর হাটের জমিদার মহিমচন্দ্র ও বিশ্বমায়া মিত্রের ছোট ছেলে। রমেন্দ্র মিত্রের বন্ধু আলতাফ মিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়ির কাছেই কৃষ্ণগোবিন্দপুর হাটে মেয়েদের জন্য খোলা স্কুলে একমাত্র শিক্ষক ছিলেন ইলা মিত্র। এভাবেই তিনি অন্দরমহল থেকে বের হয়ে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন বৃহত্তর সমাজসেবার কাজে; হয়ে ওঠেন নাচোলের রানী।

পড়াশোনা করার সময় নারী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার রাজনীতিতে প্রবেশ। ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ নামক সংগঠনের মাধ্যমে নারী আন্দোলনের এই কাজ করতে করতে তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪২ সালে (বাংলা ১৩৫০ সন) সমগ্র বাংলায় দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ, যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। এ দুর্ভিক্ষের সময় কৃষকের ওপর শোষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এ সময়কার অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শোষিত কৃষকেরা মরিয়া হয়ে ওঠে। ‘তিন ভাগের দুই ভাগ ফসল কৃষকের’ এই দাবি নিয়ে বেগবান হয় তেভাগা আন্দোলন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেন ইলা মিত্র। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি আদিবাসী সাঁওতাল ও বর্গা চাষিদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন ইলা মিত্র। ১৯৫০ সালের ২১ জানুয়ারি তাকে রাজশাহী জেলে পাঠানো হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার তাকে প্যারোলে মুক্তি দেয়। এরপর ইলা মিত্র কলকাতা চলে যান, আর পূর্ববঙ্গে ফেরেন না। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৬২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত চারবারের জন্য কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে কাজ করে যান। ১৯৯৬ সালের ৬ নভেম্বর শেষবারের মতো তিনি নাচোল কলেজ মাঠে আসেন এবং সাধারণ জনগণের মাঝে বক্তব্য দেন। ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর কলকাতায় এই মহীয়সী নারীর মৃত্যু হয় ।

সংগ্রহশালাটিতে যেতে প্রথমে একটা বড় ফটক পড়ে। এরপর আরেকটু এগিয়ে গেলে ছোট ফটক পেরিয়ে সংগ্রহশালার মূল চত্বর। টালি দেওয়া ছাদের মাটির দোতলা বাড়ি, সুন্দর করে আলপনা আঁকা। তাতে দুপাশ থেকে কাঠের সিঁড়ি ওপরে ওঠার জন্য। উভয় তলাতেই ইলা মিত্রের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন ছবি, নাচোল হত্যা মামলার ফাইল প্রভৃতি রাখা হয়েছে। চত্বরে আরো দুটো মাটির ঘর রয়েছে। ঘর দুটো তালাবদ্ধ ছিল, তাই প্রবেশ করতে পারিনি। চত্বরে ইলা মিত্রের বড় একটা প্রতিকৃতিও রয়েছে। আছে সুসজ্জিত বাগান।

চত্বরের বাইরেই ইলা মিত্রের মঠ, মুক্তমঞ্চ, শানবাঁধানো পুকুরঘাট আর চলচ্চিত্র পরিচালক সৈয়দ অহিদুজ্জামান ডায়মন্ডের একটি ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটির নিচে লেখা বিবরণ থেকে জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সুযোগ্য সন্তান জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র পরিচালক সৈয়দ অহিদুজ্জামান ডায়মন্ড ২০০৪ সালে তার ইউনিট নিয়ে নাচোলের কেন্দুয়া পঞ্চনন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৮ দিন অবস্থান করে সাঁওতাল বিদ্রোহের নির্দিষ্ট স্থানগুলোয় ‘নাচোলের রানী’ সিনেমার শুটিং সম্পন্ন করেন। ২০০৬ সালে সিনেমাটি মুক্তি পেলে বিশ্ববিবেক কেঁপে ওঠে। ইলা মিত্রের নাচোল কৃষক সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এই অঞ্চলের এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাসকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার অবদানস্বরূপ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ ও সম্মানিত করতে ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রথমে ভেবেছিলাম, যেখানে সংগ্রহশালা তৈরি করা হয়েছে, সেটাই ইলা মিত্রের বাড়ি ছিল। কিন্তু আমাদের অটোচালক ফেরার পথে কিছুটা দূরে একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন, এখানে ইলা মিত্রের বাড়ি ছিল—অন্য মানুষেরা দখল করে নিয়ে সেখানে বাড়ি করেছে। তাদের সেখান থেকে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি বলে ফসলি জমিতে সংগ্রহশালাটি তৈরি করা হয়েছে।

আমাদের রাজশাহী ফেরার টিকিট কাটা ছিল বেলা ১২টা ৪০ মিনিটের ট্রেনে। কিন্তু স্বল্প সময়ে এ দুটো জায়গা ঘুরে দেখা সম্ভব হয়নি বলে ট্রেনটি মিস করেছি। পরে স্থানীয় একজনের পরামর্শে রাজশাহী যেতে নাচোলের পরবর্তী স্টেশন আমনুরা বাইপাসে চলে গেলাম অটোতে করে। সেখান থেকে ‘ঢালার চর এক্সপ্রেস’ নামে দুপুর আড়াইটার ট্রেন ধরলাম। ঘণ্টা খানেক পর পৌঁছে গেলাম রাজশাহী। এরপর রাজশাহী শহর ঘুরে শরীর-মন জুড়িয়ে উত্তরের আবেশ মেখে রাতের বাসে ঢাকার পথ ধরলাম।

ইন্টারনেট প্যাকেজে ৩ গুণ গতি বাড়ানোর ঘোষণা

শাবিপ্রবির ভর্তি পরীক্ষা ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি, প্রতি আসনে লড়ছেন ৪৬ জন

বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির নেতৃত্বে অধ্যাপক জামাল ও রেজাউল করিম

কর্মজীবনেও থাকুক বই পড়ার অভ্যাস

নবজাতকের বাড়তি যত্ন

৭ কোটি টাকায় গড়া লেক ভরাট করে নির্মিত হচ্ছে গ্যারেজ

ঢাবিতে ৩ দিনব্যাপী নন-ফিকশন বইমেলা শুরু

চার্জে রেখেই ল্যাপটপে কাজ করে যে ভুল করছেন

আওয়ামীপন্থি শিক্ষককে ধরে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করলেন চাকসু প্রতিনিধিরা

স্নাতকোত্তরে সর্বোচ্চ সিজিপিএ পেলেন কুবি শিবির সেক্রেটারি