নববি রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থার মূলনীতি
প্রতিটি রাষ্ট্রেরই যেমন আয় থাকে, তেমনি থাকে নানা ধরনের ব্যয়। রাষ্ট্রীয় আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাতগুলোর মধ্যে সুষম সমন্বয় বজায় রাখার লক্ষ্যেই পরিচালিত হয় অর্থনৈতিক কার্যক্রম। মদিনার নববি রাষ্ট্র এবং পরে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সুসংহত আর্থিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বাইতুল মাল। এর মূল দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং মুসলিম সমাজের সার্বিক কল্যাণে সেই সম্পদের সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত ব্যয় নিশ্চিত করা। এই বিবেচনায় বাইতুল মালকে আধুনিক যুগের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়; আর এর তত্ত্বাবধায়ক কার্যত রাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রীর ভূমিকাই পালন করতেন।
সাধারণভাবে যেকোনো আর্থিক ব্যবস্থার মূল কাঠামো গড়ে ওঠে দুটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর—আয়ের উৎস এবং ব্যয়ের খাত। নববি রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থাও এই সুদৃঢ় ভিত্তির ওপরই নির্মিত হয়েছিল এবং তা মহানবী (সা.)-এর প্রদত্ত দৃষ্টান্ত ও নির্দেশনার আলোকে পরিচালিত হতো। এই ব্যবস্থায় একদিকে মুসলিম সমাজের সামগ্রিক স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছিল, অন্যদিকে সময়ের পরিবর্তন, যুগের বাস্তবতা ও সমসাময়িক প্রয়োজনকেও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
খিলাফতে রাশেদার যুগে জাকাত ছিল রাষ্ট্রের অন্যতম আয়ের উৎস। উপযুক্ত ব্যক্তিদের থেকে জাকাত সংগ্রহ এবং প্রাপ্য লোকদের মধ্যে বণ্টনের দায়িত্ব রাষ্ট্র পালন করত। এর দ্বারা মুসলিম সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা, সামাজিক কল্যাণ ও দাওয়াতের ক্ষেত্র গড়ে উঠেছিল।
দ্বিতীয় হিজরি সনে জাকাত (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) ফরজ হয়। নবীজি (সা.)-এর যুগে মদিনা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দূরদূরান্তে বিশেষ কর্মচারী পাঠানো হতো। যাদের ওপর জাকাত ফরজ হয়েছে, তাদের প্রদেয় পরিমাণ হিসাব করে নির্ধারিত নীতিমালার আলোকে তারা জাকাত সংগ্রহ করতেন এবং মুসলিমদের অধীন অঞ্চলগুলোয় তা বণ্টন করতেন।
নবীজি (সা.)-এর যুগে জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। সম্পদের মালিকের প্রতি জুলুম করা যাবে না এবং দরিদ্রের অধিকারও নষ্ট করা যাবে না। মুআজ (রা.)-কে উপদেশ দিয়ে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, ‘জাকাতের সম্পদ হিসেবে প্রদানকারীদের উৎকৃষ্ট সম্পদ গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকো।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নম্বর : ১৯৮৬।) নবী যুগে জাকাত বণ্টনের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের প্রাধান্য দেওয়া হতো। যে অঞ্চল থেকে জাকাত সংগ্রহ করা হতো, সেখানের দরিদ্র ও অন্য হকারদের মধ্যে বণ্টন করা হতো। এরপর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকত, মদিনায় পাঠানো হতো। নবীজি নিজ বিবেচনায় সর্বাধিক উপযুক্ত খাতে তা ব্যয় করতেন।
জাকাতযোগ্য সম্পদ
আল্লাহর রাসুল (সা.) স্বর্ণ-রূপা, উট, গরু, ছাগল, কৃষিপণ্য (খেজুর, শস্য ইত্যাদি), ব্যবসায়িক পণ্য, রিকাজসহ (খনিজসম্পদ) নির্দিষ্ট সম্পদ থেকে জাকাত গ্রহণ করতেন। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা (জাকাত) নাও। এর মাধ্যমে তাদের তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১০৩) আবু বকর (রা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় প্রদত্ত (উট বাঁধার) রশিও যদি কেউ জাকাত হিসেবে দিতে অস্বীকার করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব। (আল আওয়াসিম মিনাল কওয়াসিম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪৬) সাহাবিরাও এই ক্ষেত্রে সম্মতি প্রদান করেছেন। (আজ জাকাত ফি আহদির রাসুল (সা.), ন্যাশনাল জাকাত বোর্ড ইন্দোনেশিয়া, পৃষ্ঠা : ৪)
জাকাত সংগ্রহের পদ্ধতি
আল্লাহতায়ালা হিজরি দ্বিতীয় সনে মুসলিমদের জন্য জাকাত ফরজ করেন। এরপর সক্ষম ও উপযুক্ত ব্যক্তিরা নবীজির দেখানো পন্থায় জাকাত দিতেন। তখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকাত সংগ্রহের কার্যক্রমের সূচনা হয়নি।
অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধি নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তারা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। ফলে অতি দ্রুত ইসলাম মদিনার বাইরে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১০ হিজরিতে বিদায় হজের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে ও বিদায় হজ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর রাসুল (সা.) ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নেওয়াÑএসব অঞ্চল ও গোত্রের কাছে প্রতিনিধি পাঠান। প্রতিনিধিদের অন্যতম দায়িত্ব ছিল, ধনীদের থেকে জাকাত সংগ্রহ করে দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা। আল্লাহর রাসুল (সা.) ইয়েমেনে পাঠানোর সময় মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘...সেখানের জনতাকে জানিয়ে দেবে, আল্লাহতায়ালা তাদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন। তাদের মধ্যে ধনবান ব্যক্তিদের থেকে তুমি জাকাত সংগ্রহ করবে আর দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করে দেবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ১৩৯৫)
তারা বিশেষ ধরনের সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট হারে জাকাত সংগ্রহ করতেন।
নবীযুগে জাকাত ব্যয়ের খাত
জাকাত কাকে দিতে হবে এবং কোন কোন খাতে জাকাত ব্যয় করা যাবে, আল্লাহতায়ালা তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয় সদকা (জাকাত) হচ্ছে ফকির ও মিসকিনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য; (তা বণ্টন করা যায়) দাসমুক্ত করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০)
এই আয়াত অনুযায়ী আটটি খাতে জাকাত ব্যয় করা যাবে।
১ ও ২. জাকাতের সম্পদ ফকির ও মিসকিন (নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্ত)-কে দেওয়া যাবে।
৩. রাষ্ট্র যেসব কর্মচারীর জাকাত আদায় ও বণ্টন এবং হিসাব-নিকাশ রাখার দায়িত্বে নিযুক্ত করে, তাদের পারিশ্রমিক ও বেতন হিসেবে জাকাতের সম্পদ দেওয়া যাবে।
৪. ইসলামের প্রতি আগ্রহী কোনো কাফের বা মুশরিক, নতুন ইসলাম গ্রহণ করা কোনো ব্যক্তি, ইসলামে দৃঢ়স্থির থাকার জন্য যার সাহায্য দরকার, অমুসলিম ব্যক্তি যে নিজের এলাকার লোকদের মুসলিমদের ওপর হামলা করা থেকে বিরত রাখে এবং সে নিজের নিকটতম মুসলিমদের সুরক্ষা দেয়, তাদের জাকাতের সম্পদ দেওয়া যাবে।
৫. যুদ্ধবন্দির মুক্তিপণ ও ক্রীতদাস আজাদের জন্য জাকাত ব্যবহার করা যাবে।
৬. ঋণে জর্জরিত ব্যক্তিকেও জাকাত দেওয়া যাবে।
৭. জিহাদের সাজসরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্র ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র কিনতে এবং মুজাহিদের জন্য জাকাতের সম্পদ ব্যয় করা যাবে।
৮. সফরে বের হয়ে যদি কোনো মুসাফিরের সাহায্য প্রয়োজন হয়, তবু জাকাতের খাত থেকে তার মদত করা যাবে। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)
জাকাত সংগ্রহের জন্য নিযুক্ত ব্যক্তি
যেসব অঞ্চল ও গোত্র ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে নববি রাষ্ট্রের আনুগত্য প্রকাশ করেছিল, নবীজি (সা.) তাদের সবার কাছে জাকাত উত্তোলনের জন্য লোক পাঠিয়ে ছিলেন। কখনো তিনি নির্দিষ্ট গোত্রের জাকাত সংগ্রহের জন্য কোনো সাহাবিকে নিযুক্ত করতেন। কখনো এই নিয়োগ হতো অঞ্চলভিত্তিক। কখনো যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তি থাকা সাপেক্ষে গোত্রের একজনকেই এই দায়িত্ব প্রদান করতেন। নববি রাষ্ট্রের পক্ষে জাকাত উত্তোলনের দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন সাহাবির নাম ও দায়িত্ব পালনের স্থান এখানে উল্লেখ করা হলো।
অঞ্চলভিত্তিক নিয়োগ
১. ইয়েমেন : মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)
২. সানআ : মুহাজির ইবনে আবু উমাইয়া (রা.)
৩. হাজরামাওত : জিয়াদ ইবনে লাবিদ (রা.)
৪. বাহরাইন : আলা আল হাজরামি (রা.)
৫. নাজরান : আলি ইবনে আবু তালেব (রা.)
গোত্রভিত্তিক নিয়োগ
১. আসলাম ও গিফার গোত্র : বুরাইদা ইবনে হুসাইব (রা.); অন্য বর্ণনায় কাব ইবনে মালিক (রা.)-এর নামও পাওয়া যায়।
২. আসলাম ও মুজাইনা গোত্র : উবাদা ইবনে বিশর আশহালি (রা.)
৩. জুহাইনা গোত্র : রাফে ইবনে মাকিছ (রা.)
৪. বনু ফাজারাহ : আমর ইবনুল আস (রা.)
৫. বনু কিলাব : জাহহাক ইবনে সুফিয়ান ইবনে কিলাব (রা.)
৬. বনু জাবইয়ান : ইবনে লুতাইবিয়্যাহ আজদি (রা.)
৭. বনু সাদ ইবনে হুজাইম : স্থানীয় একজন ব্যক্তি
৮. বনু মসিতালিক : প্রথমে ওয়ালিদ ইবনে উকবা, পরে আব্বাদ ইবনে বিশর (রা.)
৯. তাই ও বনু আসাদ : আদি ইবনে হাতেম তায়ি (রা.)
১০. বনু হানজালা : মালিক ইবনে নুওয়াইরা (রা.)
১১. বনু সাদ : এই গোত্রের জাকাত উত্তোলনের দায়িত্ব পালন করেন দুজন ব্যক্তি; জাবরেকান ইবনে বদর ও কায়েস ইবনে আমের (রা.)।
এটা ছিল আল্লাহর রাসুল (সা.) পরিচালিত মদিনা রাষ্ট্রে জাকাত সংগ্রহের ব্যবস্থাপনা। আর নবী যুগের কাছাকাছি হওয়ায় আবু বকর (রা.)-এর জাকাত-সংক্রান্ত কার্যক্রম প্রায় অপরিবর্তিতই ছিল।