ইতিহাসের প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবই বিশ্বের কর্মসংস্থানের ধরন ও শ্রমবাজারে বড় পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে কাজের প্রকৃতি বদলেছে, কর্মীদের দক্ষতার চাহিদা পরিবর্তিত হয়েছে এবং অনেক পুরোনো পেশা বিলুপ্তির পথে গেছে।
অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ থেকে ঊনবিংশ শতকের শুরুর দিকে প্রথম শিল্পবিপ্লবের সময় বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এতে হাতে করা অনেক কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হতে শুরু করে। কারিগরদের অনেকেই কারখানাভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হন। ঊনবিংশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিংশ শতকের শুরুর দিকে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবে বিদ্যুৎ ও ব্যাপক উৎপাদনব্যবস্থার প্রসার শিল্প খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। এতে প্রচলিত অনেক দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়।
এরপর ১৯৭০-এর দশক থেকে ২০০০-এর দশক পর্যন্ত ডিজিটাল বিপ্লবের সময় কম্পিউটার ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি বিভিন্ন শিল্পে বড় পরিবর্তন ঘটায়। দাপ্তরিক কাজ ও পুনরাবৃত্তিমূলক শারীরিক শ্রমের প্রয়োজন কমে যায়। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হয়। ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসারে টাইপিস্ট, টেলিফোন সুইচবোর্ড অপারেটর ও প্রচলিত হিসাবরক্ষকদের কাজ কমে যায়। তথ্য সংরক্ষণ, যোগাযোগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয় কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থা। উৎপাদন কারখানার কাজও ক্রমে স্বয়ংক্রিয় হয়ে ওঠে। এতে অ্যাসেম্বলি লাইনের অনেক কর্মী কাজ হারালেও রোবট রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষ কর্মীদের চাহিদা বাড়ে।
এখন আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিপ্লবের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আছি। এআই শুধু কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে না, বরং অনেক পেশার সংজ্ঞাই নতুন করে তৈরি করছে। পূর্বাভাসভিত্তিক অ্যালগরিদম থেকে জেনারেটিভ এআই—প্রযুক্তির এসব অগ্রগতি মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান হারানো, কর্মীদের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং ভবিষ্যতের শ্রমবাজার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। এই পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে মানুষ কতটা দ্রুত নিজেদের দক্ষতা বাড়িয়ে নতুন চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে তার ওপর। যারা সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন, তারা এগিয়ে থাকবেন। অন্যদিকে, দ্রুত পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবেন অন্যরা।
শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাব
এআইয়ের প্রাথমিক প্রভাব পড়বে এমন সব পেশায়, যেখানে একই ধরনের শারীরিক বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করতে হয়। অন্যদিকে, জটিল তথ্য বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত পেশাগুলো এআইয়ের কারণে সুবিধা পেতে পারে। স্বল্প মেয়াদে কিছু কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে এআই নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এআই ও মেশিন লার্নিংয়ের কারণে যত কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হবে, তার চেয়ে বেশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে বিশ্বজুড়ে ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে। একই সময়ে ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কর্মসংস্থানের পরিবর্তনের পাশাপাশি এআই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ১৩ লাখ কোটি ডলার যুক্ত করবে এআই। এর ফলে বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সম্মিলিত পরিমাণ ১৬ শতাংশ বাড়তে পারে।
তবে শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়বে না। যাদের শিক্ষা ও দক্ষতার ভিত্তি দুর্বল, তাদের চ্যালেঞ্জ বেশি মোকাবিলা করতে হবে। অন্যদিকে, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীরা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
পাকিস্তানের চ্যালেঞ্জ
এআইনির্ভর পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তানের শ্রমশক্তিকে বেশ কিছু বড় বাধার মুখে পড়তে হবে। দেশটির মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচক বা হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স (এইচসিআই) মাত্র ০ দশমিক ৪১। এটি দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে কম এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোর কাছাকাছি। দেশটিতে শিক্ষাজীবনের প্রত্যাশিত মেয়াদ মাত্র ৯ দশমিক ৪ বছর। শিক্ষার মান বিবেচনায় সমন্বয় করলে কার্যকর শিক্ষাবর্ষ কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ১ বছরে। ফলে শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
পাকিস্তানের ২০২০-২১ সালের শ্রমশক্তি জরিপের (এলএফএস) তথ্য দেশটির মানবসম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং এআইসংশ্লিষ্ট চাকরির জন্য প্রস্তুতির ঘাটতি তুলে ধরে। দেশটির মোট শ্রমশক্তির ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত। এ খাতে এআইয়ের ব্যবহার তুলনামূলক কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, প্রায় ৪২ শতাংশ কর্মী কেরানির কাজ, সেবা, বিক্রয় এবং যন্ত্র পরিচালনার মতো নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক পেশায় যুক্ত। এসব কাজে সাধারণত সীমিত শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ নিয়োজিত থাকেন। এআইয়ের মাধ্যমে এসব কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেলে তারাই সবচেয়ে বেশি চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
দেশটিতে দক্ষতার ঘাটতিও প্রকট। শ্রমশক্তির ৬১ দশমিক ৫ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক বা ম্যাট্রিকুলেশনের নিচে। আর কারিগরি বা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ কর্মী। ফলে এআইনির্ভর স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রভাবে পাকিস্তানে স্বল্পদক্ষ ও শারীরিক শ্রমনির্ভর পেশার কর্মীরা তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া দেশটির অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বেশি। এআইয়ের কারণে বর্জ্য সংগ্রহ ও উৎপাদন খাতের কিছু কাজে পরিবর্তন এলে নারীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এতে তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি নারী-পুরুষের বৈষম্যও বাড়তে পারে।
পাকিস্তানের ৪৬ শতাংশ মানুষের এখনো ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই। এটি বড় একটি সমস্যা। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শিল্প খাতের চাহিদার সমন্বয়হীনতা এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের পথে বাধা তৈরি করছে। শিক্ষা সংস্কার, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণে লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ না নিলে এআইনির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পাকিস্তান পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
তবে এআইনির্ভর ভবিষ্যতের পথে পাকিস্তানের অগ্রগতির কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। দেশটিতে প্রতিবছর ২৫ হাজারের বেশি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতক তৈরি হচ্ছেন। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে এআই বিষয়ে বিশেষায়িত ডিগ্রি চালু হয়েছে।
পাকিস্তানের ফ্রিল্যান্সিং খাতও বেশ গতিশীল। দেশটিতে সক্রিয় ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ২৩ লাখ ৭০ হাজার। ২০২১-২২ অর্থবছরে তাঁরা ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ডলার বৈদেশিক আয় দেশে পাঠিয়েছেন। ফ্রিল্যান্সিং খাতের প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বিশ্বে পাকিস্তানের অবস্থান তৃতীয়। দেশটির সম্প্রসারিত তথ্যপ্রযুক্তি বাজার অর্থনীতি ও শ্রমশক্তিতে এআই যুক্ত করার প্রচেষ্টার প্রতিফলন। বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ভবিষ্যতে অগ্রগতির জন্য এসব উদ্যোগ ভিত্তি তৈরি করছে।
উৎপাদন, খুচরা বিক্রয় ও কৃষির মতো যেসব খাত হাতে করা এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। রোবট, স্বয়ংক্রিয় চেকআউট ব্যবস্থা, এআইনির্ভর পণ্য মজুত ব্যবস্থাপনা এবং স্বয়ংক্রিয় কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে স্বল্পদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। এ কারণে সম্ভাব্য চাকরি হারানোর ঝুঁকি কমাতে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
একই সঙ্গে এআই নতুন শিল্প ও পেশার সুযোগও তৈরি করছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এআইভিত্তিক সমাধান গ্রহণ করায় এআই বিশেষজ্ঞ, ডেটা বিজ্ঞানী ও মেশিন লার্নিং প্রকৌশলীদের চাহিদা বাড়ছে। উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি খাতে রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় এ বিষয়ে প্রকৌশলীদের জন্যও নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা খাতেও দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্মার্ট গ্রিড ও স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মতো এআইনির্ভর অগ্রগতি নতুন পেশার পথ খুলে দিচ্ছে।
করণীয় কী
এআই ও ডিজিটাল সাক্ষরতা, কারিগরি শিক্ষা এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি। এআইনির্ভর ভবিষ্যতের জন্য পাকিস্তানের শ্রমশক্তিকে প্রস্তুত করতে সরকার ও বেসরকারি খাত—উভয়কেই শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
সরকারকে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার এনে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম) বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো এবং শিক্ষাক্রমে এআইভিত্তিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ডেটা সেন্টারের মতো ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিনিয়োগও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দেওয়ার নীতিও গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, এআই গবেষণা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও কর্মীদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের মাধ্যমে বেসরকারি খাত উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিতে পারে।
শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাক্রম তৈরি, শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং এআইভিত্তিক নতুন উদ্যোগ বা স্টার্টআপকে সহায়তা করতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করা উচিত। সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্ব জোরদার করা গেলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি কমানো, কর্মীদের ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষতা তৈরি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
ইতিহাস বলছে, প্রতিটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। উদ্ভাবনকে গ্রহণ করে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারলে পাকিস্তানও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শ্রমশক্তির সক্ষমতা বাড়াতে এআইয়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারবে।
সূত্র: ইউএনডিপি