ইরান যুদ্ধকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার আগস্টে প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী অবস্থান দেখিয়েছে। গত মাসে দেশটিতে বিভিন্ন খাতে নিয়োগ বেড়েছে এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ১ শতাংশে স্থির রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যাওয়া এই কর্মসংস্থানের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান পাঁচ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন, নির্মাণসহ পণ্য উৎপাদনকারী খাতগুলোতে চাকরি বৃদ্ধির গতি সেবা খাতের তুলনায় বেশি ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের ফলে এসব খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্রমবাজারের এই শক্তিশালী অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় এবং কর্মসংস্থান শক্তিশালী থাকায় সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে নতুন যুক্তি তৈরি হতে পারে। তবে চলতি মাসে ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্তের আগে আগামী সপ্তাহে প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যস্ফীতির তথ্য বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
সেবা খাতেও আগস্টে উল্লেখযোগ্য গতি দেখা গেছে। ইনস্টিটিউট ফর সাপ্লাই ম্যানেজমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসের মধ্যে আগস্টেই সেবা খাত সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। নতুন ক্রয়াদেশের প্রবৃদ্ধি ২০২৩ সালের শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের একটি সূচক ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী শ্রমবাজারের বিপরীতে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। আগস্টে ইউরো অঞ্চলে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে, যা প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর ফলে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে সুদের হার বাড়ানোর চাপ আরও জোরালো হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এশিয়ার তুলনামূলক স্থিতিস্থাপকতা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও ভারত, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি এশীয় অর্থনীতি গত প্রান্তিকে প্রত্যাশার তুলনায় ভালো প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। সরকারগুলোর দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ এবং তুলনামূলক শক্তিশালী আর্থিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে বৈশ্বিক বিনিয়োগের উত্থানও এশিয়ার অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করছে।
ভারতের অর্থনীতিও এই প্রবণতার ব্যতিক্রম নয়। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ভারতের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। উৎপাদন ও আর্থিক সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। এতে ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এশীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বড় ধাক্কা খেতে পারে—এমন আশঙ্কা কিছুটা কমেছে।
অন্যদিকে চীনের কারখানা খাত আগস্টে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করলেও তা এখনো সংকোচনের মধ্যেই রয়েছে। নির্মাণ খাতের দুর্বলতা এবং সেবা খাতের মন্থরতা দেশটির অর্থনীতির সামনে ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। জাপান আবার প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে; আগামী অর্থবছরে দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির চিত্র এখন একমুখী নয়। যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমবাজারের শক্তি সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে, ইউরোপে মূল্যস্ফীতি নতুন চাপ সৃষ্টি করছে, আর এশিয়ার কয়েকটি অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মধ্যেও তুলনামূলক ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতির পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি এবং প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
সূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস ও ব্লুমবার্গ
এআরই