একটি গাড়ির পূর্ণাঙ্গ রূপ যখন সবার সামনে আসে, তখন এর পেছনের প্রকৌশলগত উদ্ভাবন ও গবেষণার গল্প অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। বিশ্বখ্যাত বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার নতুন রোডস্টার মডেলের আন্ডারবডি তৈরির প্রকৌশলগত কাজে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশি প্রকৌশলী তারেক সরোয়ার। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে ইন্টার্নশিপ করার সময় গাড়িটির আন্ডারবডির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তিন বছর পর সেই গাড়ির পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এই প্রকৌশলী।
গাড়ি নির্মাণশিল্পে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পেছনে থাকে দীর্ঘ গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জটিল প্রকৌশলগত হিসাবনিকাশ। একটি গাড়ির বাহ্যিক নকশা যতটা আলোচনায় আসে, এর কাঠামো তৈরির পেছনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো ততটা দৃশ্যমান হয় না। টেসলার রোডস্টার তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সেই অদৃশ্য কর্মপ্রক্রিয়ার একটি অংশ সামনে এনেছেন তারেক সরোয়ার।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী ২০২৩ সালে টেসলায় ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পান। সে সময় রোডস্টারের নতুন মডেলের আন্ডারবডির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ ছিল তার কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া ফল পরবর্তী সময়ে যন্ত্রাংশটির চূড়ান্ত নকশা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে টেসলার উদ্ভাবন
একটি গাড়ির আন্ডারবডি তার কাঠামোগত দৃঢ়তা ও সামগ্রিক কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত উৎপাদনপদ্ধতিতে এ ধরনের কাঠামো তৈরি করতে একাধিক ধাতব পাত ও যন্ত্রাংশ জোড়া দিতে হয়। এতে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে আলাদা কাজ করতে হয় এবং একাধিক যন্ত্রাংশের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হয়।
টেসলা এই প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে পুরো আন্ডারবডিকে একটি মাত্র যন্ত্রাংশ হিসেবে তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদনপ্রক্রিয়াকে আরো সহজ ও কার্যকর করা এবং গাড়ির কাঠামো নির্মাণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা সহজ ছিল না। এত বড় একটি কাঠামো একবারে ঢালাই করে তৈরি করতে হলে উপাদানের বৈশিষ্ট্য, ঢালাইপ্রক্রিয়া এবং তৈরি হওয়া যন্ত্রাংশের স্থায়িত্ব—সবকিছুই নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সামান্য ত্রুটিও যন্ত্রাংশটির কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয় ও বড় প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ
তারেক সরোয়ারের বর্ণনা অনুযায়ী, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টেসলা বিশেষ ধরনের অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয় তৈরি করেছিল। শেষ পর্যন্ত একটিমাত্র যন্ত্রাংশ হিসেবে আন্ডারবডি ঢালাই করার প্রক্রিয়া আয়ত্তে আনে প্রতিষ্ঠানটি। এ প্রকল্পের উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে তারেক প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে একটি করে যন্ত্রাংশ তৈরির কথা উল্লেখ করেছেন। উত্তর আমেরিকায় এত বড় একটি যন্ত্রাংশ একবারে ঢালাই করার আর কোনো উদাহরণ তার জানা নেই বলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে জানিয়েছেন তিনি। একটি মাত্র যন্ত্রাংশে বড় কাঠামো তৈরি করার ধারণা বাস্তবায়নে উপযুক্ত উপাদান নির্বাচন এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শুধু বড় আকারের একটি যন্ত্রাংশ তৈরি করতে পারলেই প্রকৌশলগত সাফল্য আসে না; সেটিকে নির্ধারিত মান বজায় রেখে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্ডারবডির স্থায়িত্ব যাচাইয়ে তারেকের ভূমিকা
প্রকল্পটিতে তারেক সরোয়ারের কাজের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিভিন্ন তীব্র আবহাওয়ায় আন্ডারবডির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করা। একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পরিবেশে ব্যবহৃত হলে এর উপাদানের বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্ষমতায় কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা বোঝার জন্য এ ধরনের বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
বিশেষ করে ধাতব যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার পরিবর্তন, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এর স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়ন করতে হয়। নকশা চূড়ান্ত করার আগে এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত ধারণা পাওয়া গেলে সম্ভাব্য দুর্বলতা শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সহজ হয়। ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ধাতব পদার্থের গঠন, বৈশিষ্ট্য, স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করা হয়। গাড়ি নির্মাণের মতো প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে এ জ্ঞানের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারেকের দায়িত্বও ছিল সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নতুন ধরনের আন্ডারবডির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ করা। তার কাজের ফলাফল পরবর্তী সময়ে যন্ত্রাংশটির চূড়ান্ত নকশা তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ায় প্রকল্পটির উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় এই মূল্যায়নের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।
তিন বছর পর পূর্ণাঙ্গ গাড়ি দেখে ফিরে দেখা
২০২৩ সালে টেসলায় কাজ করার সময় রোডস্টারের যে প্রকৌশলগত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারেক সরোয়ার, তিন বছর পর সেই গাড়ির পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখতে পাওয়া তার জন্য ছিল বিশেষ অভিজ্ঞতা। প্রকল্পের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে কাজ করার সময় চূড়ান্ত পণ্যটি কেমন হবে, তা পুরোপুরি উপলব্ধি করা সবসময় সম্ভব হয় না। পরে সেই কাজের বাস্তব রূপ সামনে এলে নিজের অবদানের সঙ্গে চূড়ান্ত পণ্যের যোগসূত্র নতুনভাবে অনুভব করা যায়। তারেকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে উঠে এসেছে এমনই এক অভিজ্ঞতা, যেখানে একটি গাড়ির দৃশ্যমান নকশার আড়ালে থাকা প্রকৌশলগত কাজের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার স্মৃতি রয়েছে। প্রযুক্তির জগতে বড় কোনো উদ্ভাবন সাধারণত একজনের একক প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হয় না। এর পেছনে থাকে বিভিন্ন বিভাগের প্রকৌশলী ও গবেষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং অসংখ্য কারিগরি সিদ্ধান্ত। একটি যন্ত্রাংশের নকশা তৈরি থেকে শুরু করে সেটিকে বাস্তব ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। টেসলার রোডস্টার প্রকল্পে তারেক সরোয়ারের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। বুয়েটে অর্জিত প্রকৌশলজ্ঞান কাজে লাগিয়ে বিশ্বখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা যেমন তার পেশাগত জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়, তেমনি এটি আধুনিক গাড়ি নির্মাণে উপাদানবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিশ্লেষণের গুরুত্বও তুলে ধরে।