ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নতুন সংযোজিত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর একটি হলো ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে এ পদে নির্বাচিত হয়ে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন মো. মাজহারুল ইসলাম। মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে নিজের কাজ, অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
প্রশ্ন : দায়িত্ব নেওয়ার সময় আপনার প্রধান লক্ষ্য কী ছিল?
মাজহারুল ইসলাম : নির্বাচনের আগে থেকেই আমার চিন্তা ছিল—এই পদে থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য কী করা যায়। আমি উপলব্ধি করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকে থাকলেও চাকরির বাজারে সুযোগের পরিধি তার চেয়ে অনেক বড়। তাই আমার লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের শিল্প খাত, করপোরেট জব, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্পর্কে সচেতন করা এবং তাদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা।
প্রশ্ন : দায়িত্ব নেওয়ার পর কোন বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে?
মাজহারুল ইসলাম : আমি চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের শুধু বিসিএসকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বের করে আনতে। এজন্য ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া-গভর্নমেন্ট সংলাপ, করপোরেট সংযোগ, উচ্চশিক্ষাবিষয়ক সেমিনার ও গবেষণামুখী কার্যক্রম আয়োজন করেছি। আমার বিশ্বাস, একাডেমিক শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে যে ফাঁক রয়েছে, তা কমানো জরুরি।
প্রশ্ন : বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের কোন বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত?
মাজহারুল ইসলাম : প্রথমেই ক্যারিয়ার নিয়ে অনুসন্ধান করতে হবে। কোন ক্ষেত্রে কাজ করতে চান, কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, কীভাবে সেখানে পৌঁছানো যাবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতে হবে। ক্যারিয়ার লক্ষ্য নির্ধারণে ছয় মাস বা এক বছর সময় লাগলেও সমস্যা নেই। কিন্তু লক্ষ্য ঠিক করার পর সেটি অর্জনের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা ধরে এগোতে হবে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী অনার্সের শেষ বর্ষে এসে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে শুরু করে, যা বড় একটি সমস্যা।
প্রশ্ন : দায়িত্ব পালনকালে উল্লেখযোগ্য কাজগুলো কী?
মাজহারুল ইসলাম : দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ স্কিল সামিট, ইয়ুথ এমপ্লয়াবিলিটি সামিট, স্টুডেন্ট রিসার্চ কনফারেন্স এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলার মতো বড় আয়োজন করেছি। শিক্ষার্থীদের জন্য আটটি ব্যাচে বিনা মূল্যে স্পোকেন ইংলিশ কোর্স পরিচালনা করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন হল ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সফট স্কিল উন্নয়ন কর্মশালা আয়োজন করেছি।
দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। এর মধ্যে হলভিত্তিক কম্পিউটার ল্যাব, ইন্টার্নশিপ, ইনোভেশন হাব, জব ফেয়ার ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য। ইতোমধ্যে তিনটি হলে আইটি অ্যান্ড ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে এবং আরো কয়েকটি হলে কাজ চলমান রয়েছে।
প্রশ্ন : শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী বলে মনে করেন?
মাজহারুল ইসলাম : আমি মনে করি সমস্যার বড় অংশই কাঠামোগত। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট ক্যারিয়ারমুখী নয়। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ক্যারিয়ারের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে না পারা। পাশাপাশি আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ও দক্ষতা উন্নয়নে পিছিয়ে পড়ে।
প্রশ্ন : কোন কাজটি করতে চেয়েও করতে পারেননি?
মাজহারুল ইসলাম : অনেক উদ্যোগ মাঝপথে থেমে গেছে। প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের এটুআই-এর সঙ্গে একটি বড় জব ফেয়ার আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল, সেটিও শেষ পর্যন্ত করা যায়নি। বিজনেস ফ্যাকাল্টিতে ই-লাইব্রেরি চালুর উদ্যোগও ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রশ্ন : বাজেট ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা কতটা প্রভাব ফেলেছে?
মাজহারুল ইসলাম : এটি ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। অনেক সময় স্পন্সর চূড়ান্ত হওয়ার পরও বিভিন্ন কারণে তারা সরে গেছে। ফলে সীমিত সম্পদ নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবেও আর্থিক চাপ নিতে হয়েছে। পর্যাপ্ত অর্থায়ন থাকলে আরো অনেক বড় উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো।
প্রশ্ন : শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন?
মাজহারুল ইসলাম : শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক সাড়া আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। বিভিন্ন জরিপে অধিকাংশ শিক্ষার্থী আমার কাজের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। এটিই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।
প্রশ্ন : মেয়াদের শেষ সময়ে এবং ভবিষ্যতের জন্য আপনার পরিকল্পনা কী?
মাজহারুল ইসলাম : মেয়াদের বাকি সময়ে হলগুলোয় ক্যারিয়ার ল্যাব স্থাপন, কিছু ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর, সেমিনার আয়োজন এবং টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ চালুর বিষয়ে কাজ করতে চাই। আর পরবর্তী ডাকসুর জন্য এমন একটি মানদণ্ড রেখে যেতে চাই, যা ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।
প্রশ্ন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী?
মাজহারুল ইসলাম : শিক্ষা, গবেষণা ও ক্যারিয়ার উন্নয়নকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আরো বেশি সোচ্চার হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন কোনো বিষয়ে সম্মিলিতভাবে কণ্ঠ তোলে, তখন পরিবর্তন আসবেই। তাই ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের প্রশ্নেও তাদের নেতৃত্ব দিতে হবে।