ছোটবেলা থেকেই মানুষের কল্যাণে কাজ করার স্বপ্ন ছিল তার। পাশাপাশি নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ও ছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, অধ্যবসায় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে এবার জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা পেয়েছেন ময়মনসিংহের তরুণ উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী ইসতাক আহমেদ তারেক। সামাজিক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ পেয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে এ পুরস্কার গ্রহণ করেন ইসতাক আহমেদ তারেক।
ইসতাক আহমেদ তারেক ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার কৃতী সন্তান। চীন থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে স্নাতক সম্পন্ন করা এই তরুণ ২০১৮ সালে ময়মনসিংহ শহরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পাঠগৃহ ফাউন্ডেশন’। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে।
পাঠগৃহ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা, পাঠচক্র আয়োজন, বিনামূল্যে বই পড়ার সুযোগ সৃষ্টি, এতিমদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ, পথশিশুদের কল্যাণে কাজ, মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরি এবং অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্যসহায়তা প্রদানসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশংসা অর্জন করেছে সংগঠনটি।
সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন ইসতাক। ২০২৪ সালে ময়মনসিংহের গাঙ্গিনারপাড় এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘পাঠগৃহ ক্যাফে’। এটি ময়মনসিংহের প্রথম রিডিং ক্যাফে হিসেবে পরিচিত। এখানে কফির পাশাপাশি বই পড়ার সুযোগ রয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও শিক্ষার্থীরা অবসর সময় কাটাতে ক্যাফেটিতে আসেন। পাঠকরা রেজিস্টার খাতায় নাম লিখে বই বাসায় নিয়েও পড়তে পারেন।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে পাঠগৃহ ফাউন্ডেশন ও পাঠগৃহ ক্যাফের পাশাপাশি যাত্রা শুরু করে ‘পাঠগৃহ একাডেমি’। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে চীনা ভাষা শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে অনেক তরুণ-তরুণী আইটি ও চীনা ভাষা শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।
চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে এগিয়ে চলা
নিজের উদ্যোগের শুরুর দিকের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ইসতাক আহমেদ তারেক বলেন, নতুন ও অপ্রচলিত কোনো উদ্যোগ শুরু করার পথ কখনোই মসৃণ হয় না। তার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রথাগত চাকরির বাইরে গিয়ে সমাজসেবা কিংবা পাঠগৃহ ক্যাফের মতো ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়ায় শুরুতে পরিবারের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা ও শঙ্কা ছিল।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাজে তরুণদের নতুন উদ্যোগকে অনেকেই শুরুতে গুরুত্ব দিতে চান না। শহরের প্রচলিত আড্ডার বিকল্প হিসেবে তরুণদের বইমুখী করা কিংবা উন্মুক্ত পাঠের আয়োজন অনেকের কাছেই প্রথম দিকে অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কেউ কেউ এসব উদ্যোগকে সাময়িক আবেগ বলেও মনে করেছিলেন।’
তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার অভাব এবং মানুষের মনমানসিকতায় পরিবর্তন আনার চ্যালেঞ্জগুলোকে বাধা হিসেবে না দেখে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়েছেন তিনি। কাজের ধারাবাহিকতা ও সততা দেখে একসময় পরিবারও পাশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতাও পেয়েছেন।
পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি
‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ অর্জনের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ইসতাক আহমেদ তারেক বলেন, জাতীয় পর্যায়ের এই সম্মাননা তার জীবনের অন্যতম আনন্দ ও গৌরবের মুহূর্ত। তবে এ পুরস্কারকে তিনি শুধু নিজের অর্জন হিসেবে দেখতে চান না।
তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কার শুধু আমার একার নয়; এটি ময়মনসিংহের সর্বস্তরের বইপ্রেমী মানুষ, আমাদের স্বেচ্ছাসেবী দল এবং সব শুভানুধ্যায়ীর ভালোবাসার প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে ময়মনসিংহে রিডিং কালচার পুনরুজ্জীবিত করা, তরুণদের দক্ষ করে তোলা এবং শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যে পরিশ্রম করেছি, আজ তার স্বীকৃতি পেয়েছি।’ এই সম্মাননা তার দায়িত্ববোধ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও শিক্ষার বিস্তার, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং একটি আলোকিত সমাজ গঠনে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চান।
তরুণদের প্রতি আহ্বান
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে ইসতাক আহমেদ তারেক বলেন, শুধু নিজের কথা না ভেবে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে প্রত্যেকেরই কিছুটা সময় দেওয়া উচিত। যেকোনো পরিবর্তনের সূচনা হয় ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে। আশপাশের শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া মানুষ কিংবা নানা সমস্যায় জর্জরিত সমাজের পরিবর্তনে বড় বাজেটের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সদিচ্ছা ও সততা।
তিনি তরুণদের বই পড়া, নতুন দক্ষতা অর্জন এবং ইতিবাচক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমকে শুধু বিনোদনের জন্য ব্যবহার না করে জ্ঞানার্জন ও দক্ষতা বৃদ্ধির কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। হতাশ না হয়ে ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে কাজ শুরু করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকলে একদিন সাফল্য ও স্বীকৃতি আসবেই।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, পড়াশোনা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি একটি ভালো ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে চান তিনি। স্বপ্ন পূরণে হাল না ছেড়ে ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।
এদিকে ইসতাক আহমেদ তারেকের এমন অর্জনে আনন্দ ও গর্ব প্রকাশ করেছেন ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসনাত জাহান খান। তিনি বলেন, ইসতাক আহমেদ তারেকের এই সাফল্যে ত্রিশাল উপজেলা প্রশাসন আনন্দিত ও গর্বিত। তার মতো আরো তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হোক এবং তারা সামাজিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুন—এটাই প্রত্যাশা।