খেলাফতে রাশেদার শাম অভিযান
আজনাদাইন প্রান্তরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাইজেন্টাইন সেনাপতি থিওডোরের শোচনীয় পরাজয়ের পর শামের রাজনৈতিক ও সামরিক মানচিত্র নাটকীয় পরিবর্তনের মুখে এসে দাঁড়ায়। ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে অর্জিত ঐতিহাসিক বিজয় ছিল একটি সাম্রাজ্যের দম্ভ চূর্ণ করার সূচনা। মরুভূমির তপ্ত বালুকা, ক্ষুরধার তরবারির তেজ আর সর্বোপরি ঈমানের বলে বলীয়ান মুসলিম বাহিনী তখন অপরাজেয় এক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
আজনাদাইনের সেই মহাযুদ্ধের পর মুসলিম সেনাপতিদের রণকৌশল ও ক্ষিপ্র গতি বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াসকে এতটাই বিচলিত করে তুলেছিল যে তিনি আন্তাকিয়ার রাজপ্রাসাদে বসে চরম অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হন। আজনাদাইনের পর ইতিহাস এবার দুই বাহিনীকে মুখোমুখি করাতে যাচ্ছে ইয়ারমুকের ময়দানে।
দিকে দিকে যুদ্ধ
আজনাদাইনের পরাজয়ের পর রোমান সৈন্যরা বিশৃঙ্খল হয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের বড় একটি অংশ উত্তর দিকে হোমস এবং দামেশকের দিকে পালিয়ে যায়, আরেক দল সুরক্ষিত শহর ও দুর্গগুলোয় আশ্রয় নেয়। মুসলিম সেনাপতিরা এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। আবু বকর (রা.)-এর নির্দেশনায় মুসলিম বাহিনী কয়েকটি শক্তিশালী ইউনিটে বিভক্ত হয়ে সিরিয়ার কেন্দ্রস্থলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। রোমানদের পুনর্গঠিত হওয়ার কোনো সুযোগ না দেওয়াই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।
এই পর্যায়ে শহর ও দুর্গজয়ের চিত্র ছিল খুব নাটকীয়। ধূলিধূসরিত প্রান্তরে হাজার হাজার উষ্ট্রারোহী ও অশ্বারোহী যোদ্ধার পদধ্বনি আর তাকবির ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকে শামের দিগন্ত। প্রথম পতনের তালিকায় ছিল বুসরা। বুসরা ছিল একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং কৌশলগত দুর্গ। বুসরার পতনের মাধ্যমে মুসলিমরা জর্ডান উপত্যকা এবং দামেশকের মধ্যবর্তী সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর মুসলিমদের লক্ষ হয়ে দাঁড়ায় ফিহল (Fahl) বা প্রাচীন পেল্লা। ফিহলের যুদ্ধে বাইজেন্টাইনরা মুসলিমদের অগ্রযাত্রা রোধ করতে সেচনালাগুলো কেটে দিয়ে পুরো এলাকা কর্দমাক্ত করে ফেলেছিল, যা ইতিহাসে ‘মার্শ যুদ্ধ’ বা ‘ইয়াওমুর রাদাগা’ নামে পরিচিত। কিন্তু মুসলিম বাহিনী সেই প্রতিকূলতা জয় করে এবং রোমানদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে।
আবারও প্রস্তুতি
৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে যখন মুসলিম বাহিনী দামেশকের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। তিনি জানতেন, যদি দামেশকের পতন ঘটে, তবে সমগ্র ‘শাম অঞ্চল’ তার হাতছাড়া হয়ে যাবে।
হেরাক্লিয়াস আন্তাকিয়া থেকে তার শ্রেষ্ঠ সেনানায়কদের তলব করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আর্মেনীয় জেনারেল ভাহান (Vahan), যিনি ছিলেন এই অভিযানের অন্যতম প্রধান অধিনায়ক। এছাড়া থিওডোর ট্রাইথিরিয়াস এবং ঘাসানিদ রাজকুমার জাবালা ইবনুল আইহামের নেতৃত্বে একটি বিশাল ‘বহুজাতিক বাহিনী’ গঠিত হয়। রোমানদের রণকৌশল ছিল মূলত রক্ষণাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি। তারা মুসলিমদের একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানে আটকে রেখে তাদের সাপ্লাই লাইন (সরবরাহ ব্যবস্থা) বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করে।
রোমান বাহিনীর প্রধান হাতিয়ার ছিল তাদের ভারী অশ্বারোহী সৈন্য বা ‘ক্যাটাফ্রাক্টস’ (Cataphracts) এবং অভিজ্ঞ পদাতিক বাহিনী। তারা তাদের সৈন্যদের মনোবল বাড়াতে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে; পাদ্রিদের যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হয় এবং ক্রুশ বহন করে যুদ্ধের অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়।
মুসলিম শিবির
বিপরীতে, খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী তাদের হালকা অশ্বারোহীদের ক্ষিপ্রতাকে পুঁজি করে আক্রমণের পরিকল্পনা সাজায়। মুসলিম সেনাপতিরা তাদের সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠিত করেন এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর মতো অভিজ্ঞ সাহাবিদের অধীনে বিভিন্ন ডিভিশনে ভাগ করে দেন। তাদের প্রধান শক্তি ছিল সাহসিকতা এবং ভূপ্রকৃতির সঠিক ব্যবহার। মুসলিমদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রোমানদের বিশাল জনবলের মোকাবিলা করা। কারণ রোমানদের সৈন্যসংখ্যা অনেক ক্ষেত্রে মুসলিমদের তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি ছিল।
উভয় বাহিনীই জানত, ইয়ারমুক অঞ্চলের এই আসন্ন সংঘাত শামের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে। মুসলিমরা তাদের বিজয়রথ অব্যাহত রাখতে মরিয়া, আর বাইজেন্টাইনরা তাদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে বদ্ধপরিকর।
ইয়াকুসা : ইয়ারমুক যাত্রার পথে
ইয়ারমুকের মহাযুদ্ধের (৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দ) প্রায় দুই বছর আগে ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইয়ারমুক নদীর উত্তর তীরে ইয়াকুসা বা ওয়াকুসা নামক স্থানে উভয় বাহিনীর মধ্যে প্রথম বড় আকারের সংঘর্ষ ঘটে। এটি ছিল ইয়ারমুক অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখবন্ধ।
দামেশকের দিকে মুসলিমদের অগ্রযাত্রা রুখতে সম্রাট হেরাক্লিয়াসের জামাতা থমাস একটি শক্তিশালী ডিলেয়িং ফোর্স (Delaying Force) বা অগ্রগামী দল পাঠান। তাদের লক্ষ্য ছিল ইয়াকুসা নামক স্থানে মুসলিমদের গতিপথ রুদ্ধ করা। বাইজেন্টাইনরা নদীর খাড়া পাড়ের সুযোগ নিয়ে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ চালায়। যুদ্ধের শুরুতেই রোমান ধনুর্বিদরা মুসলিম বাহিনীর ওপর তীরের বৃষ্টি বর্ষণ করে।
খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। তিনি তার অশ্বারোহী বাহিনীকে কয়েকটি ছোট দলে ভাগ করে বাইজেন্টাইনদের পার্শ্বভাগ (Flanks) থেকে আক্রমণের নির্দেশ দেন। মুসলিম যোদ্ধাদের অবিশ্বাস্য সাহসিকতা এবং তলোয়ার যুদ্ধের নিপুণতা বাইজেন্টাইনদের অপ্রস্তুত করে ফেলে।
ইয়াকুসার এই যুদ্ধে নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল অসামান্য। খালিদ (রা.) নিজে যুদ্ধের সামনের সারিতে থেকে তলোয়ার চালিয়ে সৈন্যদের উদ্বুদ্ধ করেন। বাইজেন্টাইনদের এই অগ্রগামী দলের পরাজয় দামেশকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। এটি ছিল ইয়ারমুক অঞ্চলের প্রথম বড় সংঘর্ষ, যেখানে মুসলিমরা প্রমাণ করেছিল, প্রতিকূল ভূপ্রকৃতিতেও তারা বাইজেন্টাইনদের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর।
ইয়াকুসা যুদ্ধে মুসলমানদের জয়ে বেশ কিছু সুবিধা হয়। প্রথম হলো, দামেশকের দক্ষিণ পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে যায়। বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয়ে শহর অবরোধ করে। দ্বিতীয়ত, আজনাদাইনের পর ইয়াকুসার এই বিজয় মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে এই বিশ্বাস দৃঢ় করে যে, রোমান সাম্রাজ্যের পতন অনিবার্য। তৃতীয়ত, এই যুদ্ধে প্রমাণিত হয়, রোমান কমান্ড সিস্টেম মুসলমানদের গেরিলা পদ্ধতির মতো দ্রুতগতির আক্রমণের মোকাবিলা করতে অক্ষম। সম্রাট হেরাক্লিয়াস তার রণকৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হন এবং বুঝতে পারেন, কেবল বিশাল সংখ্যা দিয়ে এই যুদ্ধের ফলাফল বদলানো সম্ভব নয়।
এই পরাজয়ের পর রোমানরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে এবং বড় আকারের ফিল্ড ব্যাটেল এড়িয়ে দুর্গের ভেতর থেকে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য হিতে বিপরীত হয়। তত দিনে শামের এই মহান অঞ্চল থেকে অস্ত যেতে শুরু করেছে রোমান সূর্য।
শেষের শুরু
ইয়ারমুক অঞ্চলের এই প্রথম বড় সংঘর্ষ বা ইয়াকুসার যুদ্ধ ছিল আসলে একটি বিশাল ঝড়ের পূর্বাভাস মাত্র। আজনাদাইন থেকে ইয়াকুসা—বিজয়ের এই প্রতিটি ধাপ মুসলিম বাহিনীকে ইয়ারমুকের সেই চূড়ান্ত মঞ্চের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, যেখানে লক্ষাধিক সৈন্যের মুখোমুখি হবে ঈমানের বলে বলীয়ান মাত্র কয়েক হাজার মর্দে মুজাহিদ। আকাশ থেকে নেমে আসবে খোদায়ি নুসরতের বারিধারা। কিন্তু ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে মদিনার আকাশে নেমে আসছে বিষাদের ছায়া। প্রথম খলিফা রাসুলের সবচেয়ে প্রিয় সাহাবি আবু বকর সিদ্দিক (রা.) প্রস্তুতি নিচ্ছেন তার এই পার্থিব জীবন সমাপ্তির। শুরু হতে যাচ্ছে এক মহান খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর আরেক স্বর্ণালি যুগ।