হোম > সাহিত্য সাময়িকী

সমকালীন সংস্কৃতিকে নবীজি কীভাবে মোকাবিলা করেছেন

ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ

সব প্রশংসা আল্লাহতায়ালার জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসুল, তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবি আর যারা তাঁদের সঠিক পথ অনুসরণ করেছেন তাঁদের ওপর।

‘সংস্কৃতি’ (Culture) শব্দটি বর্তমান দুনিয়ায় সবচেয়ে আলোচিত ও চলিত পরিভাষাগুলোর অন্যতম। এ বিষয়ে মানুষ বিভিন্ন মতে বিভক্ত; প্রতিটি দল নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় বা বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এর ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন বিষয়ে তা প্রয়োগ করে। মুসলিম নীতিমালার আলোকে বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা দরকার।

আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহে আমি এই নিবন্ধে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করেছি। আমার বোঝাপড়ার বিষয়—

‘মহানবী (সা.) তাঁর যুগের সংস্কৃতিকে মোকাবিলা করেছেন?’

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আলোচনাটিকে কয়েকটি অধ্যায়ৈ ভাগ করা যায়—

গোড়ার কথা : সংস্কৃতির সংজ্ঞা ও প্রকার।

প্রথম অধ্যায় : ক্ষতিকর সংস্কৃতির সঙ্গে মহানবীর (সা.) মোকাবিলা।

দ্বিতীয় অধ্যায় : কল্যাণকর সংস্কৃতির সঙ্গে মহানবীর (সা.) মোকাবিলা।

তৃতীয় অধ্যায় : ক্ষতিকর ও কল্যাণকর—উভয়ের মধ্যে দোদুল্যমান সংস্কৃতির সঙ্গে মহানবীর (সা.) মোকাবিলা।

আল্লাহতায়ালার ইজাজতে আমরা সংক্ষেপে যা উল্লেখ করেছি—

গোড়ার কথা : সংস্কৃতির সংজ্ঞা ও প্রকার

‘সাকাফাহ’ (সংস্কৃতি) শব্দটি অন্যতম মৌলিক আরবি পরিভাষা। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য এই শব্দের ধাতুগত মূল বা রুট (Root) অর্থ জানা আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে ইবনু ফারিস বলেন—‘(ثقف) বা আরবি বর্ণ সা-কাফ-ফা বিশিষ্ট এটি একটি একক শব্দ, যার দিকে বিভিন্ন শাখা প্রশাখা ফিরে যায়। এর অর্থ হলো কোনো কিছুর ত্রুটি দূর করে সোজা করা। যেমন বলা হয় : ‘সাকাফতু আল-কানাতা’ (আমি বর্শাটি সোজা করেছি) যখন তুমি তার বাঁকা হওয়া দূর করো। কবি বলেছেন : নজর আল-মুসাকাফ ফি কু’উবি কানাতিহি, হাত্তা ইউক্বিমা সাকাফাহু মিনআদাহা (দক্ষ কারিগর তার বর্শার গাঁটগুলো দেখল, যতক্ষণ না সে তার বর্শার বাঁকা অংশ সোজা করে নেয়)’

ইবনু ফারিসের বক্তব্য থেকে প্রতিভাত হয় যে, ‘সাকাফা’ মূল ধাতুটির অর্থ তিনটি বিষয়ের আবর্তে ঘুরপাক খায়—

প্রথমত. কোনো কিছু সোজা করা; অর্থাৎ কোনো কিছুর বক্রতা দূর করে সোজা করা। এটি বস্তুগত বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

দ্বিতীয়ত. কোনো কিছু সঠিকভাবে বোঝা ও উপলব্ধি করা। এটি অবস্তুগত বা ভাবগত বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তৃতীয়ত. কোনো কিছু শক্তভাবে ধরা এবং তাতে বিজয়ী হওয়া। উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে—আল-বাকারা : ১৯১ আয়াত, আল-আহজাব : ৬১ আয়াত।

পক্ষান্তরে পারিভাষিক সংজ্ঞা হিসেবে ইসলামি ঐতিহ্য বা ট্রাডিশনে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না, কারণ এটি তাদের কাছে প্রচলিত ছিল না। বর্তমান যুগে যা পাওয়া যায়, তা মূলত পশ্চিমা সংস্কৃতির সম্পূর্ণ অনুকরণ ও প্রভাব মাত্র।

এটি বিভিন্ন উপায়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার মধ্যে অধ্যাপক মালিক বিন নাবির সংজ্ঞাটি অন্যতম। তিনি বলেন : ‘নৈতিক গুণাবলি এবং সামাজিক মূল্যবোধের একটি সমষ্টি, যা একজন ব্যক্তি জন্ম থেকেই তার জন্মস্থানের পরিবেশে প্রাথমিক পুঁজি হিসেবে লাভ করে। সুতরাং সংস্কৃতি হলো এমন একটি পরিবেশ, যার মাধ্যমে ব্যক্তি তার স্বভাব ও ব্যক্তিত্ব গঠন করে।’

তবে আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা হলো ‘একাডেমি অব অ্যারাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ’র (মাজমাউল লুগাতিল আরাবিয়্যাহ) সংজ্ঞা। সেটি হলো—‘বিজ্ঞান, জ্ঞান এবং শিল্পকলার সেই সমষ্টি, যা অর্জনে পারদর্শিতা কামনা করা হয়।’

এই নিবন্ধে সংস্কৃতির কর্মমূলক বা প্রায়োগিক সংজ্ঞা হিসেবে আমি এই সংজ্ঞাটিই গ্রহণ করব।

প্রথম অধ্যায় : ক্ষতিকর সংস্কৃতির সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর মোকাবিলা

মহানবী (সা.)-এর আদর্শ ও জীবনধারা অনুসরণ করলে দেখা যায়, দ্বীনকে ধ্বংস করে এবং এর মূলনীতিগুলো বাতিল করে এমন প্রতিটি সংস্কৃতির প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে তিনি শক্ত ও দৃঢ় ছিলেন। এর কয়েকটি প্রধান উদাহরণ—

পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলো পাঠ করা

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বশেষ নবী। তাঁর শরিয়ত-পূর্ববর্তী সব শরিয়তকে রহিত বা মানসুখ করে দিয়েছে। আসমানি কিতাব পবিত্র কোরআনুল কারিমও পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর ওপর চূড়ান্ত বিচারক বা নিয়ন্ত্রক (মোহাইমিন) [আল-মায়িদা : ৪৮]। এর আলোকেই আমরা দেখতে পাই, যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আহলে কিতাবের কোনো গ্রন্থ পাঠ করার সময় নিষেধ করেছিলেন এবং অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছিলেন : ‘সে সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন! যদি মুসা আলাইহিস সালামও জীবিত থাকতেন, তবে আমার অনুসরণ করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকত না।’

জাদু ও জ্যোতিষবিদ্যা (কাহানাত)

ইসলাম জাদুকে কুফরি বলে ঘোষণা করেছে এবং সাব্যস্ত করেছে যে আল্লাহতায়ালা ছাড়া কেউ অদৃশ্যের খবর জানে না [আন-নামল : ৬৫]। হাদিসে জাদুকে ধ্বংসাত্মক সাতটি পাপের (সাবউল মউবিকাত) অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং জ্যোতিষী বা গণকদের কাছে যাওয়াকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

জাহেলি যুগের উৎসবগুলো

উৎসব বা ঈদ হলো প্রতিটি জাতিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দানকারী অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক নিদর্শন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন মদিনাবাসীর দুটি বিশেষ খেলাধুলার দিন দেখে তিনি বলেন : ‘নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা এর পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে দুটি উত্তম দিন দান করেছেন : ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।’

দ্বিতীয় অধ্যায় : কল্যাণকর সংস্কৃতির সঙ্গে মহানবীর (সা.) মোকাবিলা

দ্বীনের কল্যাণ করে এবং সমাজ গঠনে সহায়তা করে এমন সংস্কৃতির প্রতি মহানবী (সা.)-এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত উদার ও উন্মুক্ত। তিনি সেগুলো ইসলামি রঙে রঙিন করে গ্রহণ করেছিলেন—

মোহর বা সিলমোহর (খাতাম) ব্যবহার করা : আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী চিঠিপত্রে মোহর ব্যবহারের প্রথা থাকায় তিনি রুপার একটি আংটি তৈরি করান, যার খোদাই করা লেখা ছিল : ‘মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ’।

যুদ্ধের নানা কৌশল ও সরঞ্জাম : আহজাব বা খন্দকের যুদ্ধে সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শে পরিখা খননের পারস্য কৌশল তিনি অত্যন্ত সফলভাবে গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া তায়েফ অবরোধের সময় তিনি ক্যাটাপল্ট ও বিশেষ অবরোধ যন্ত্র নির্মাণ কৌশল শিখে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।

কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রথা : দূতদের হত্যা করা হয় না—এই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রথার প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি মুসাইলামার দূতদের ওপর মুরতাদের শাস্তি প্রয়োগ করেননি।

বিদেশি ভাষার সঙ্গে আচরণ : হুজ্জত কায়েম ও দ্বীনের প্রচারে যোগাযোগের স্বার্থে তিনি জায়দ ইবনু সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হিব্রু বা ইহুদিদের ভাষা শিখে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

তৃতীয় অধ্যায় : ক্ষতিকর ও কল্যাণকর—উভয়ের মধ্যে দোদুল্যমান সংস্কৃতির সঙ্গে মহানবীর (সা.) মোকাবিলা।

এমন কিছু সংস্কৃতি রয়েছে, যা পুরোপুরি কোনো একটি দিকে ঝুঁকে পড়ে না; বরং বৃহত্তর কল্যাণ (মাসলাহাত) অর্জিত হলে তিনি তা করতেন, আর ক্ষতি বেশি হলে বর্জন করতেন—

সম্মান প্রদর্শনের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়া : আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে বিনম্র শ্রদ্ধায় দাঁড়িয়ে যাওয়া অনুচিত হলেও শত্রুর মনে ত্রাস সৃষ্টি ও শক্তির প্রদর্শনীর জন্য হুদায়বিবয়ার সন্ধির সময় সাহাবিদের দাঁড়িয়ে থাকাকে তিনি অনুমোদন করেছিলেন।

ছবি আঁকা ও পুতুল খেলা : প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও ছোট মেয়েদের ঘরোয়া কাজের প্রশিক্ষণ ও আদব শেখার উদ্দেশ্যে খেলনা পুতুল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

কবিতা ও অলংকারপূর্ণ বক্তব্য : যেসব কবিতায় কুফরি বা অশ্লীলতা রয়েছে, তা নিষিদ্ধ হলেও হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বা ইসলামের বিজয়ের পক্ষে রচিত কবিতাকে তিনি উৎসাহিত করেছিলেন।

বাদ্যযন্ত্র ও সংগীত : সাধারণ অবস্থায় বাদ্যযন্ত্র কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও ঈদের দিন আনন্দ প্রকাশ এবং বিয়ে উৎসবের ঘোষণা দেওয়ার জন্য দফ বাজানো ও গান গাওয়াকে তিনি অনুমোদন করেছিলেন।

শেষকথা

মহানবীর (সা.) জীবনচরিত ও সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সংস্কৃতি মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্বীনের মূল ভিত্তি বা আকিদার পরিপন্থী ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতিকে তিনি বর্জন করেছেন, সমাজগঠনমূলক ও কল্যাণকর সংস্কৃতিকে নিজস্ব মূল্যবোধে অর্জিত করে গ্রহণ করেছেন। পরিবর্তনশীল বা দোদুল্যমান সংস্কৃতিগুলোর ক্ষেত্রে বৃহত্তর কল্যাণ ও অকল্যাণের মাপকাঠিতে বিচার করেছেন।

মূল : ড. রাবীয়ি লাউর

দুই টুকরা চাঁদ

জাবালে নূর থেকে বিচ্ছুরিত আলোর উত্তরাধিকার

হাসান রোবায়েত ও জুলাইয়ের কবিতা

বাংলাদেশের কালচারাল ক্যালেন্ডার: আগস্ট-ভাদ্র-রবিউল আউয়াল

আন্তর্জাতিক আরবি কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০২৬

সুলতানি ও মোগল আমলে ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা

রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ী: ইতিহাস ও প্রত্নচিহ্নের সন্ধানে

গোলামি থেকে স্বাধীনতা, জাতি গঠন ও স্বাধীন রাষ্ট্রের বুনিয়াদ

ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে বরিশাল

ঢাকার লালবাগ