লালবাগ দুর্গ বা লালবাগের কেল্লা ঢাকা শহরে অবস্থিত মোগল আমলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। শাহজাদা আজম এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে উল্লেখ থাকলেও যেহেতু তিনি ঢাকায় স্বল্পকাল অবস্থান করেন ও সমসাময়িক সূত্রে এটির কোনো সমর্থন পাওয়া যায় না; তাই প্রকৃতপক্ষে সুবেদার শায়েস্তা খাঁয়ের নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে কাজ চলাকালে তার মেয়ে ইরান দুখত বা পরী বিবির মৃত্যু হলে তাকে এখানে সমাহিত করে শায়েস্তা খাঁ এটির নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। বর্তমানে দুর্গের অর্ধেক অংশ দেখা যায়। বাকি অংশ দক্ষিণ দিকে ছিল। উঁচু প্রাকার-বেষ্টিত এ দুর্গের মধ্যে তিন গম্বুজের একটি মসজিদ, একটি সমাধি-ভবন, দোতলা দরবার হলসহ একটি হাম্মাম রয়েছে। পশ্চিম দিকে একটি উঁচু স্থানে পুব-পশ্চিমে লম্বা এক সারি ফোয়ারা ও পানি সংরক্ষণের জন্য একটি জলাধার ছিল। এ জলাধার থেকে সমগ্র দুর্গের মধ্যে পানি সরবরাহ করা হতো। দক্ষিণ দিকে একটি পুকুর এবং দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় একটি তোরণ ও পুবদিকে দুটি তোরণ রয়েছে। আদি অবস্থায় দক্ষিণ-পশ্চিম কোনার তোরণটিই দুর্গের প্রধান প্রবেশ-তোরণ ছিল। বুড়িগঙ্গা নদী তখন দুর্গের পশ্চিম দিকের দেয়াল ঘেঁষে প্রবাহিত হতো। নদীটি বর্তমানে অনেক দূরে সরে গিয়েছে। দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও এটি উদ্যান-সংবলিত একটি মাজার কমপ্লেক্স ছিল বলে ধারণা করা যায়।
পশ্চিম দিকের তিন গম্বুজের মসজিদটি দুটি পার্শ্বীয় খিলান (lateral arch) দ্বারা তিন ভাগে বিভক্ত। পুবদিকে তিনটি প্রবেশপথ ও মসজিদের অভ্যন্তরে কিবলা দিকে তিনটি মিহরাব রয়েছে। অভ্যন্তর ভাগের দেয়ালের উপরের দিকে কয়েকটি উৎকীর্ণলিপি রয়েছে। উৎকীর্ণলিপির সাক্ষ্য অনুযায়ী মসজিদটি ১০৯৫ হিজরি বা ১৬৮৩-৮৪ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত। এ সময় বাংলার সুবেদার বা গভর্নর ছিলেন শায়েস্তা খাঁ ।
পরী বিবির মাজারে ৯টি কক্ষ রয়েছে। এগুলোর ছাদ কর্বেল পদ্ধতিতে তৈরি। মধ্যবর্তী কক্ষটিতে পরী বিবির কবর স্থাপিত। এ কক্ষটির ছাদও কর্বেল পদ্ধতিতে নির্মিত ও এটির উপরিভাগে তাম্র নির্মিত একটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজটি আদিতে সোনালি ছিল বলে ধারণা করা হয়। উত্তর-পুব কক্ষের দেয়াল-গাত্রে কয়েকটি আদি গ্লেজড টাইল রয়েছে। অন্য কয়েকটি টাইল এখান থেকে খুলে জাদুঘরে রাখা হয়েছে। সমাধি-ভবনের চার পাশে চারটি জলাধার ও এগুলোর মধ্যে ফোয়ারা ছিল। দক্ষিণ দিকের ফোয়ারাটি বন্ধ করে তার ভেতরে কয়েকজনকে কবর দেওয়া হয়।
মোগলদের অন্যান্য হাম্মামের মতোই লালবাগ হাম্মামের সঙ্গে একটি দরবার হল সংযুক্ত ছিল। দরবার হলটি দোতলার। এ দুর্গের হাম্মাম অংশে কয়েকটি কক্ষ রয়েছে। গ্রিক ও রোমান হাম্মামের মতো এখানেও কয়েকটি কক্ষ থাকার কথা। যেমন : পোশাক পরিবর্তনের ঘর (Apodyterium), ঠান্ডা পানির ঘর (frigidarium), হাল্কা গরম পানির ঘর (tepidarium), গরম পানির ঘর (caldarium)। হাম্মামের মধ্যে ছোট একটি চৌবাচ্চাও আছে। পুবদিকের একটি ঘরে চুলা ছিল। এ চুলা থেকে কাঠের সাহায্যে আগুন জ্বালিয়ে পানি গরম করা হতো এবং পাইপের সাহায্যে হাম্মামের ভেতরে গরম পানি ও বাষ্প সরবরাহ করা হতো। হাম্মামের তাপব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। শীতকালে গরম বাতাস ও গ্রীষ্মকালে ঠান্ডা বাতাসের ব্যবস্থা ছিল।
লালবাগ একটি দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও এটি উদ্যান ও পানির ফোয়ারাসংবলিত একটি সমাধি কমপ্লেক্স হিসেবে দেখা যায়। এখানে সমাধিকেন্দ্রিক একটি উদ্যান ও পানির ফোয়ারা ছিল। এখানে (axial lay out) দেখা যায়। লালবাগ শায়েস্তা খাঁর ওয়াকফ সম্পত্তি হওয়ায় পশ্চিমদিকের নব আবিষ্কৃত ও সংস্কার করা কক্ষগুলো হাফেজ এবং কারিদের অবস্থান ও ইবাদতের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। তারা ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে এখানে শায়িত মৃত ব্যক্তিদের জন্য প্রার্থনা করতেন। মুসলিম বিশ্বে মাজারকেন্দ্রিক এমন স্থাপনার নজির আছে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময়ে অনেক সিপাহি এখানে আশ্রয় নিয়েছিল। ইংরেজদের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে অনেক সিপাহি নিহত হয় ও অনেককে বন্দি করা হয়। এসব বন্দিকে আন্টাঘর ময়দানে ফাঁসি দেওয়া হয়। এটিই বর্তমানে ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক।