বাংলায় মুসলমানদের উৎপত্তি-তত্ত্বের বিশ্লেষণ
আলাউদ্দীন হোসেন শাহ প্রশাসনিক কাজে বিপুলসংখ্যক ‘সৈয়দ, মোগল এবং আফগান’কে নিযুক্ত করেছিলেন। খুব সম্ভবত তারা ছিলেন দিল্লির টালমাটাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে আগত অভিজাত শ্রেণি; কারণ সেই সময়ে লোদী বংশের উত্থানে দিল্লিতে সৈয়দ রাজবংশের পতন ঘটেছিল। হোসাইনী আমলে, বিশেষত আলাউদ্দীন হোসেন শাহর সুদীর্ঘ রাজত্বকালে বাংলায় মসজিদ স্থাপত্যের যে ব্যাপক সমারোহ পরিলক্ষিত হয়, তা মূলত অভিবাসী মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান জনবসতি ও জনমিতিক পরিবর্তনেরই এক অকাট্য সাক্ষ্য। (দেখুন পূর্বে, পৃষ্ঠা : ২০৭-২০৯) এই মসজিদগুলোর শিলালিপিতে উৎকীর্ণ প্রতিষ্ঠাতাদের নাম থেকে বিষয়টি বিশেষভাবে পরিস্ফুটিত হয়।
বাংলায় হোসেন শাহর সিংহাসন আরোহণ এবং দিল্লির লোদীদের প্রবল চাপে জৌনপুর সালতানাতের পতন ছিল প্রায় সমসাময়িক ঘটনা। জৌনপুরের ভাগ্যবিড়ম্বিত সুলতান হোসেন শাহ শর্কী তার অনুচরসহ বাংলার সমনামীয় শাসকের আশ্রয়ে চলে আসেন এবং এখানেই স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। পরে ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে পানিপথের যুদ্ধে বাবরের হাতে লোদী বংশের চূড়ান্ত পতন ঘটলে তাদেরও বাংলায় আশ্রয় খোঁজার পালা শুরু হয়। ফলে, বিপুলসংখ্যক আফগান অভিজাত তাদের পরিবার ও বিশাল অনুসারী বাহিনী নিয়ে হোসেন শাহর সুযোগ্য উত্তরসূরি নুসরাত শাহর দরবারে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সুলতান নুসরাত শাহ এই ভাগ্যবিড়ম্বিত অভিজাতদের প্রত্যেককে ‘নিজ নিজ পদমর্যাদা ও পূর্বাবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন পরগনা ও গ্রাম’ অনুদান হিসেবে প্রদান করেছিলেন। (পূর্বে দেখুন, পৃষ্ঠা : ২১৭) অধিকন্তু, তিনি স্বয়ং বাংলায় আগত প্রয়াত সুলতান ইব্রাহিম লোদীর মেয়েকে বিয়ে করে এই কূটনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করেন। (রিয়াজুস সালাতীন, পৃষ্ঠা : ১৩২)
পরে আফগান ও মোগল শাসনামলেও বাংলায় বহিরাগত মুসলমানদের অভিবাসন ও বসতি স্থাপনের এই নিরবচ্ছিন্ন ধারা অব্যাহত ছিল। পরাক্রমশালী আফগান বীর শের শাহ প্রশাসনিক সুবিধার্থে বাংলাকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে (ইউনিট) বিভক্ত করেন এবং সেই অঞ্চলগুলোয় নিজ অনুচর বাহিনীসহ বিশ্বস্ত অনুগতদের স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের বন্দোবস্ত করে দেন। ঐতিহাসিকদের একাংশ অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই এই ধারণা পোষণ করেন, শের শাহ কর্তৃক সৃষ্ট এই জায়গিরগুলোই কালক্রমে সে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যেগুলো পরে সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে মোগল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী ও প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। (হিস্ট্রি অব বেঙ্গল, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১৭৭। আরো দেখুন পূর্ববর্তী অধ্যায়-১)
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ব্লকম্যান এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘ঝাড়খণ্ড (ছোটনাগপুর)-এর দুর্ধর্ষ উপজাতিদের অতর্কিত আক্রমণের বিরুদ্ধে এক স্থায়ী রক্ষীব্যূহ হিসেবে শের শাহর শাসনকালের আগে ও পরে পাঠান জায়গীরদারদের এই সুপরিকল্পিত বসতি স্থাপনের প্রত্যক্ষ ফলেই বীরভূমের সুবিশাল মুসলিম জমিদারি গড়ে উঠেছিল, যা পরবর্তীকালে খোদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকেও বেশ ঝামেলায় ফেলেছিল। (জেএএসবি (J.A.S.B.)- ১৮৭৩, সংখ্যা : ৩, পৃষ্ঠা : ২২২-২২৩)
বাংলার শেষ স্বাধীন আফগান শাসক দাউদ খান কররানীর (দাউদ শাহ) সামরিক শক্তির বহর ছিল বিস্ময়কর; তার বাহিনীতে ৪০ হাজার সুসজ্জিত অশ্বারোহী, ৩ হাজার ৩০০ রণহাতি এবং ১ লাখ ৪০ হাজার দুর্ধর্ষ পদাতিক সৈন্যের পাশাপাশি অগণিত অনুচর ও ভৃত্য ছিল। পরে মোগলদের কাছে চূড়ান্তভাবে বশ্যতা স্বীকার করার পরও, এই বিশাল আফগান বাহিনীর সিংহভাগকেই বাংলায় বসবাস করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল; যদিও রাজনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের জায়গির ও নিষ্কর ভূমির পরিমাণ বহুলাংশে হ্রাস করা হয়েছিল কিংবা সেগুলো নামমাত্র খাজনার আওতাভুক্ত করা হয়েছিল।
বস্তুত, বাংলায় মোগল শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ কখনোই এমন ছিল না যে, পূর্ববর্তী যুগে আগত যেসব মুসলমান এ ভূখণ্ডে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছিলেন, তারা কোনোভাবেই এ দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। বরং বাস্তব চিত্রটি ছিল ভিন্ন; যারা ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অধিক সক্রিয় ছিলেন, তারা নিছক কৌশলগত কারণেই প্রধান নগরীগুলো থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে অপেক্ষাকৃত প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।
ফলত, শূন্য হয়ে পড়া প্রশাসনিক সদর দপ্তরগুলোয় স্বভাবতই মোগল সুবেদার, রাজ কর্মকর্তা এবং সৈন্যরা নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন। রাজমহল, ঢাকা এবং মুর্শিদাবাদের মতো ঐতিহাসিক শহরগুলো মূলত এই মোগলদের প্রশাসনিক সদর দপ্তর ও অভিজাত বসতি হিসেবেই নবজীবন লাভ করেছিল। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের রাজত্বকালে মোগল সুবেদাররা সাধারণত নির্দিষ্ট কয়েক বছরের মেয়াদে বাংলার শাসনভার গ্রহণ করতেন; কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের অধীন অসংখ্য অধস্তন কর্মকর্তা এবং নিঃসন্দেহে তাদের বংশধররা এই ভূখণ্ডেই শিকড় গেড়েছিলেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা নগরীতে একদা এত বিপুলসংখ্যক আর্মেনীয় বণিকের বসতি স্থাপিত হয়েছিল, এলাকাটি ‘আর্মানিটোলা’ নামে পরিচিতি লাভ করেÑযে স্মৃতি আজও অমলিন। এমনকি সম্রাট আকবরের শাসনকালেও বেশ কিছু উলামা ও মাশায়েখ, যাদের আদর্শিক অবস্থান সম্রাটের কাছে অপ্রীতিকর ঠেকেছিল, তারা বাধ্য হয়ে বাংলাসহ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোয় নির্বাসিত বা স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। (মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ, আবদুল কাদির বাদাউনী, পৃষ্ঠা : ২৭৮।)
পরে শাহজাহানের দ্বিতীয় ছেলে শাহ সুজা এক বিশাল রাজকর্মকর্তা ও অনুচর বাহিনী নিয়ে বাংলার শাসনভার পরিচালনা করেন। আওরঙ্গজেবের সঙ্গে ভ্রাতৃঘাতী উত্তরাধিকার যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর, সুজা তার পরিবারসহ ভাগ্যবিড়ম্বিত হয়ে আরাকানে পলায়ন করেন; কিন্তু তার অগণিত অনুসারী বাংলার পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোর দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষভাগ থেকে, বিশেষ করে করতলব খান তথা মুর্শিদকুলী খানের সুবেদারির সময়কাল থেকে দেখা যায়, সব মোগল সুবেদারই বাংলায় স্থায়ীভাবে থেকে যেতে শুরু করেন। মুর্শিদকুলী খান থেকে শুরু করে তার জামাতা সুজা উদ্দীন খান এবং পরাক্রমশালী আলীবর্দী খান—তাদের প্রত্যেকেই বিপুলসংখ্যক আত্মীয়স্বজন, সুহৃদ ও সৈন্যবাহিনী নিয়ে এ দেশে এসেছিলেন। বিহার থেকে সংগৃহীত আলীবর্দী খানের আফগান সৈন্যদের একটি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া এসব মানুষ ও তাদের উত্তরসূরিরা এই বাংলাকেই তাদের চিরস্থায়ী আবাস হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘সিয়ার-উল-মুতাখখিরীন’-এ আলীবর্দী খানের শাসনকালে বাংলায় আগমন করা এবং এ দেশে স্থায়ী হওয়া অগণিত বিদগ্ধ ও জ্ঞানী ব্যক্তির কথা সবিস্তারে উল্লিখিত হয়েছে। (সিয়ারুল মুতাখখিরীন, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১৬৫-১৮৫।)
১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে নাদির শাহর ভয়াবহ আক্রমণ এবং দিল্লি ও তৎসংলগ্ন এলাকায় তার পৈশাচিক লুণ্ঠনের ফলে এক বিপুল জনস্রোত প্রাণের মায়ায় দেশত্যাগ করে বাংলার দিকে ধাবিত হয় এবং নবাব সুজা উদ্দীন মুহম্মদ খানের মহানুভব আশ্রয়ে সমবেত হয়। (তারিখে মনসুরী, ফজল রাব্বি, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ১৯-২০-এ উদ্ধৃত।) ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবাব তার দরবারে আগত এই অজ্ঞাতকুলশীল নবাগতদের প্রতি অত্যন্ত সহৃদয় ও বদান্য ছিলেন। তিনি এ দেশে তাদের সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করতে এবং বসতি স্থাপনের সব সুব্যবস্থা গ্রহণে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি। (সিয়ারুল মুতাখখিরীন, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৩২৩-৩২৪।) ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্নে বাংলার মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালনকারী সৈয়দ আমীর আলীর পূর্বপুরুষরাও নাদির শাহর সেই আক্রমণের অব্যবহিত পরেই এ দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। (মেমোয়ার্স অফ আমীর আলী (Memoirs of Ameer Ali), সম্পাদনা: এস. আর. ওয়াস্তি, লাহোর, ১৯৬৮, পৃষ্ঠা : ৬-৭।) তাদের পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই মোগল শাসক ও সুবেদাররা অভিজাত পরিবার, জ্ঞানী-গুণী ও সুফি-দরবেশদের জন্য এবং মসজিদ, মাদরাসা ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান রক্ষণাবেক্ষণের তাগিদে অকাতরে নিষ্কর ভূমি বা লাখেরাজ জমি দিতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেই সময় বাংলায় ২০টিরও অধিক প্রকারের এমন নিষ্কর বা লাখেরাজ জমির অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীকালে দেশটি ব্রিটিশ শাসনাধীনে চলে গেলে একের পর এক কঠোর ও নিবর্তনমূলক আইনের মাধ্যমে এই নিষ্কর জমির সিংহভাগই বাজেয়াপ্ত করা হয়। তা সত্ত্বেও, ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষভাগ পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ জেলায় ৭০০ লট, বগুড়ায় ৬৪৯ লট, বর্ধমানে ১৭০৫ লট এবং হুগলিতে ৮৯৪ লট নিষ্কর জমির অস্তিত্ব ছিল। (ফজল রাব্বি, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৩৮।) অন্য জেলাগুলোতেও এর সংখ্যা ছিল প্রায় সমরূপ। শুধু এই একটি তথ্যই বাংলায় বসতি স্থাপনকারী অভিবাসী অভিজাত ও বিদগ্ধ পণ্ডিত পরিবারগুলোর বিশাল ব্যাপ্তি ও সংখ্যার একটি স্বচ্ছ ধারণা প্রদান করে। আগেই উল্লিখিত হয়েছে, এ দেশের অসংখ্য পরগনা, গ্রাম, নগর ও জনপদ আজও তাদের আদি বসতি স্থাপনকারী ও স্বত্বাধিকারীদের নাম ধারণ করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
এমনকি বাংলায় ব্রিটিশ শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও, মারাঠা দস্যুদের (বর্গি) লুণ্ঠন কিংবা উত্তর ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বাঁচতে উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক মুসলমান এই বাংলায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নিজেরাই বেশ কয়েকজন ক্ষমতাচ্যুত মুসলিম রাজপুত্র ও অভিজাতকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করেছিলেন, যারা কালক্রমে এই নগরীরই স্থায়ী অধিবাসী হয়ে যান। টিপু সুলতানের উত্তরাধিকারী এবং অযোধ্যার (Oudh) রাজন্যবর্গ এভাবেই কলকাতায় বসতি স্থাপন করেন। এই রাজপরিবারগুলোর বংশধর এবং সুদূর প্রবাস থেকে আগত অপর এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব নওয়াব আব্দুল লতিফের সম্মিলিত প্রয়াসেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় প্রথম মুসলিম সাহিত্য-তথা-রাজনৈতিক সংগঠনের গোড়াপত্তন ঘটে। হুগলির প্রাতঃস্মরণীয় জনহিতৈষী হাজী মুহম্মদ মুহসীন ছিলেন একজন ফারসি মুসলমান, যিনি ব্রিটিশ আমলের ঊষালগ্নে এ দেশে বসতি স্থাপন করেছিলেন। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলিম বণিক ও ব্যবসায়ীরাও সে সময় কলকাতায় ভিড় জমাতেন। খোদ কলকাতা শহরে মিসরীয় বণিকদের এমন এক সমৃদ্ধ উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল, যা ‘মিসরী-গঞ্জ’ নামে পরিচিতি লাভ করে—ব্যস্ততম এই এলাকাটি আজও সেই নাম বহন করে চলেছে।
ঢাকার প্রখ্যাত খাজা পরিবার, ময়মনসিংহের খান-পন্নি, ইউসুফজাই, গজনভি এবং অন্যান্য সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারগুলো... এবং ত্রিপুরার ও রাজশাহীর মির্জা পরিবার, যশোর ও খুলনার সৈয়দ বংশ—তারা সবাই ছিলেন মূলত বিদেশি বংশোদ্ভূত। বস্তুত, বাংলার প্রতিটি জেলা ও নিভৃত জনপদে আজও এমন অনেক মুসলিম পরিবার সগৌরবে টিকে আছে, যারা আরব, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, এশিয়া মাইনর, ইরান ও তুরস্কসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে আগত পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার বহন করছেন। (রাব্বি, প্রাগুক্ত।) বর্তমান গ্রন্থের সীমিত পরিসরে এসব পরিবারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া অসম্ভব। তবে এটুকু বলাই যথেষ্ট, এ দেশের ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টিপাত করলে এই অকাট্য সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে—দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের সব অঞ্চলের মধ্যে সম্ভবত বাংলাতেই সুদীর্ঘ ৬০০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন মুসলিম শাসনামলে সর্বাধিকসংখ্যক বিদেশি বংশোদ্ভূত মুসলমান স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিলেন।