মধ্যযুগে যখন বাংলা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন সেখানের শাসকরা শুধু নিজেদের রাজ্য পরিচালনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাংলার সুলতানদের বহু স্থাপত্য ও জনকল্যাণমূলক কাজ আজও তাদের উদারতা ও দূরদর্শিতার সাক্ষ্য বহন করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর ও কম আলোচিত অধ্যায় হলো মক্কা ও মদিনায় প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি মাদরাসা—আল মাদরাসাতুল গিয়াসিয়া আল বাঙ্গালিয়া।
পবিত্র মক্কা ও মদিনার ভূমিতে বাংলার একজন সুলতানের উদ্যোগে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা মধ্যযুগের বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাসে অনন্য ঘটনা। এটা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন বাংলা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রান্তিক শাসনাঞ্চল ছিল না; বরং এটি বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক যোগাযোগ রক্ষা করত।
একজন জ্ঞানপিপাসু সুলতান
মক্কা ও মদিনায় গিয়াসিয়া মাদরাসা দুটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বাংলার ইলিয়াস শাহি বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের নাম জড়িয়ে আছে। তিনি ইলিয়াস শাহি বংশের তৃতীয় সুলতান এবং সিকান্দার শাহের পুত্র। ১৩৯০ খ্রিষ্টাব্দে গোয়ালপাড়ার যুদ্ধে সিকান্দার শাহ নিহত হলে গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ ক্ষমতায় আসেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তার শাসনকাল ছিল আনুমানিক ১৩৮৯-৯০ থেকে ১৪১০-১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত (হিজরি ৭৯২-৮১৩)। এই সময়টি বাংলার ইতিহাসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক সাফল্য এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার জন্য স্মরণীয়।
গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ ছিলেন এমন এক শাসক, যিনি তরবারির শক্তির পাশাপাশি কলমের শক্তিকেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি নিজে আরবি ও ফারসি ভাষায় কবিতা রচনা করতেন এবং পারস্যের প্রখ্যাত কবি হাফিজ শিরাজির সঙ্গে তার পত্রবিনিময় ছিল বলে জানা যায়। তার দরবারে বাংলা সাহিত্যও সমৃদ্ধ হয়। কবি শাহ মুহম্মদ সগীর তারই পৃষ্ঠপোষকতায় ‘ইউসুফ-জোলেখা’ কাব্য রচনা করেন, আর কৃত্তিবাস ওঝা এই সময়েই রামায়ণের বাংলা অনুবাদ ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’ রচনা করেন বলে ধারণা করা হয়।
তার কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আঞ্চলিক সীমারেখার ঊর্ধ্বে। দিল্লি সালতানাতের প্রভাব মোকাবিলায় তিনি চীনের মিং সম্রাটের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৪০৫, ১৪০৮ ও ১৪০৯ সালে চীনে দূত পাঠান এবং সম্রাট ইয়ংলের কাছ থেকেও প্রতিদানে দূত ও মূল্যবান উপহার লাভ করেন। উত্তর ভারতের জৌনপুর সালতানাতের সঙ্গেও তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল; জৌনপুর সালতানাতের প্রভাবশালী আমির ও মন্ত্রী খাজা জাহানের কাছে তিনি হাতিসহ উপহার পাঠিয়েছিলেন। এই ব্যাপক কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতাই তাকে হেজাজের মতো দূরবর্তী অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের মহৎ উদ্যোগ নিতে সক্ষম করেছিল।
মক্কায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা
১৩৮৯ থেকে ১৪১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসনামলে সুলতান একাধিকবার মক্কা ও মদিনাবাসীর জন্য উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন। ১৪১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তার প্রতিনিধি ইয়াকুত গিয়াসিকে বিপুল অর্থসম্পদসহ মক্কার শাসকের কাছে পাঠান। তার উদ্দেশ্য ছিল মক্কায় জমি কিনে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা।
অনুমতি লাভের পর ইয়াকুত গিয়াসি মসজিদুল হারামের ‘বাবে উম্মে হানি’র পাশে দুটি বাড়ি কেনেন এবং সেখানে ‘আল মাদরাসাতুল গিয়াসিয়া আল বাঙ্গালিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি মক্কার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী সাইয়েদ হাসান আজলানের থেকে দুটি বাগান কিনে মাদরাসার জন্য ওয়াক্ফ করে দেন। বাগান দুটি কেনা হয়েছিল ১২ হাজার মিসকাল স্বর্ণ দিয়ে। মাদরাসার জন্য ৫০০ মিসকাল স্বর্ণ দিয়ে একটি বাড়ি কিনে তা ওয়াক্ফ করা হয়েছিল। এসব ওয়াক্ফ সম্পত্তির আয় থেকেই মাদরাসার যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করা হতো।
৮১৩ হিজরির রমজান মাসে মাদরাসা নির্মাণকাজ শুরু হয় আর ৮১৪ হিজরির জমাদাল উলা মাসে মাদরাসার নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ৮৯৪ হিজরিতে এটি সংস্কার করা হয়।
এটি ছিল মক্কার প্রথম মাদরাসা যেখানে (ইসলামের) চারটি মাজহাবই শিক্ষা দেওয়া হতো। ঐতিহাসিক আব্দুল করিমের বর্ণনা থেকেও জানা যায়, সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ কেবল মাদরাসা প্রতিষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং তিনি সরাইখানা নির্মাণ, খাল খনন এবং মক্কা ও মদিনার অধিবাসীদের জন্য মূল্যবান উপঢৌকন পাঠানোর মাধ্যমে বিস্তৃত জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
তার উজির খান জাহান, যার প্রকৃত নাম ইয়াহইয়া এবং পিতার নাম আরব শাহ, এই মহৎ কাজে তাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেন। সুলতানের পক্ষ থেকে হাবশি ভৃত্য ইয়াকুতের মাধ্যমে বিপুল অর্থ মক্কা ও মদিনায় পাঠানো হয় এবং সেই অর্থেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়। মক্কায় সুলতানের প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটি বাবে-উম্মে হানির পাশে অবস্থিত ছিল।
শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিচালনা
আল মাদরাসাতুল গিয়াসিয়া আল বাঙ্গালিয়া ছিল একটি সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে চার মাজহাব—হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি অনুসারে পাঠদান পরিচালিত হতো। প্রতিটি মাজহাবের জন্য পৃথক শিক্ষক দায়িত্ব পালন করতেন। তারা হলেন জামালুদ্দিন মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ শাফেয়ি, শিহাবুদ্দিন আহমদ বিন জিয়া হিন্দি হানাফি, তাকিউদ্দিন মুহাম্মদ বিন আহমদ ফাসি মালেকি ও সিরাজুদ্দিন আবদুল লতিফ বিন আবুল ফাতাহ ফাসি হাম্বলি। মাদরাসার মূল ছাত্র কোটা ছিল ৬০ জন। তাদের মধ্যে ২০ জন শাফেয়ি, ২০ জন হানাফি, ১০ জন মালেকি ও ১০ জন হাম্বলি, যা তৎকালীন ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার বহুমাত্রিকতা ও সহনশীলতার প্রতিফলন।
ওয়াক্ফ সম্পদের আয় সুনির্দিষ্টভাবে পাঁচটি খাতে ব্যয় করা হতো। এর প্রধান খাতগুলো ছিল—শিক্ষকদের প্রয়োজন পূরণ, শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয়, আবাসিক শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের প্রয়োজন মেটানো, অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, পানি সরবরাহ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয়।
এই সুনিয়ন্ত্রিত আর্থিক কাঠামো মাদরাসাটিকে একটি আদর্শ ও টেকসই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করেছিল।
আলেম ও শিক্ষার্থীদের অবদান
এই মাদরাসায় বহু খ্যাতিমান আলেম শিক্ষকতা করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবদুল ওয়াহাব তাজুদ্দিন বিন জাহিরাহ, আবদুল কাদির ফাসি মক্কি এবং মুহাম্মদ জালাল আবু সাআদাত। তাদের জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষাদান কার্যক্রম মাদরাসাটির খ্যাতি সুদূরপ্রসারী করে তোলে।
এছাড়া এখানকার শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অনেকে পরবর্তীকালে খ্যাতিমান আলেম হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
মদিনায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা
সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের জ্ঞানসেবা কেবল মক্কায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি মদিনাতেও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতিনিধি হাজি ইকবালকে মসজিদে নববির কাছে জমি কিনে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে এবং এর জন্য স্থায়ী ওয়াক্ফ সম্পত্তি নির্ধারণ করতে তিনি নির্দেশ দেন।
হাজি ইকবাল মসজিদে নববির কাছে বাবুস সালামের নিকটবর্তী ‘হুসনুল আতীক’ নামক স্থানে একটি প্রাচীন দুর্গ ক্রয় করে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই উদ্যোগ মদিনায়ও জ্ঞানচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলে। মক্কার ও মদিনার উভয় মাদরাসাই ‘গিয়াসিয়া মাদরাসা’ বা ‘বাঙালি মাদরাসা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ হজযাত্রীদের সহায়তা এবং পবিত্র স্থানগুলোর উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি আরাফা ময়দানে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ৩০ হাজার মিসকাল স্বর্ণ প্রদান করেন। এই উদ্যোগ তার জনকল্যাণমুখী মনোভাব এবং মুসলিম বিশ্বে অবদান রাখার আন্তরিকতার পরিচায়ক।
মাদরাসাটির বিলুপ্তি
১৫ শতকে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ কর্তৃক মক্কা ও মদিনায় প্রতিষ্ঠিত ‘গিয়াসিয়া মাদরাসা’ ছিল হেজাজ অঞ্চলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে মক্কার শরিফ হাসান ইবনে আজলানের আর্থিক অনিয়ম, সুলতানের মৃত্যুর পর অর্থ না আসা, স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং পরবর্তীকালে হারামাইন শরিফাইনের সম্প্রসারণের ফলে এককালের সেরা এই ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠটি কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।
সুলতানি বাংলার আন্তর্জাতিক পরিচয়
মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসকে শুধু দিল্লি বা উত্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে দেখলে এর প্রকৃত পরিচয় ধরা পড়ে না। মক্কা ও মদিনায় গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের প্রতিষ্ঠিত গিয়াসিয়া মাদরাসা দুটি প্রমাণ করে, স্বাধীন সুলতানি বাংলা তখন নিজস্ব রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার শক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে সক্রিয় ছিল।
মক্কা-মদিনার মতো পবিত্র নগরীতে দূরে বাংলার শাসকের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা শুধু দানশীলতার নিদর্শন ছিল না; এটি বাংলার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও মুসলিম জ্ঞানচর্চার প্রতি তার অঙ্গীকারও প্রকাশ করে। পারস্য, জৌনপুর ও চীনের সঙ্গে বাংলার বিস্তৃত যোগাযোগের প্রেক্ষাপটে গিয়াসিয়া মাদরাসা দুটি তাই সুলতানি বাংলার জ্ঞান, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার এক অনন্য স্মারক।