আবুল কাসেম ফজলুল হক
১৯৮৯ সালের শেষদিকের কোনো এক সময় হবে। প্রথমবার গিয়েছি আমার শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের বাসায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের উল্টো দিকেই থাকতেন তিনি। তখন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ গোটা বাংলাদেশ। ক্লাসে আর অফিসকক্ষে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা হয় অনেকের মাঝখানে, দূরত্ব থাকে। বাসায় বসে কথা বলতে গিয়ে আমার প্রথমেই মনে হয়েছে, এমন জ্ঞানী ও খ্যাতিমান একজন শিক্ষক-লেখক অতটা নিরহংকার, সাদামাটা মানুষ!
ভালোমন্দ-সম্পর্কিত প্রশ্নের পরই স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলো, কী ভাবছ দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ সম্পর্কে? কী হবে বলে মনে হয়?’ পরিষ্কার মনে আছে আমার, আকস্মিক এই জটিল প্রশ্নে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম, চট করে কিছু বলতে পারিনি। এদিকে স্যার আরো সম্পূরক প্রশ্ন করে উৎসাহ দিয়ে উসকে দিচ্ছিলেন আমাকে। একসময় ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করি। কী কী বলেছিলাম এখন মনে নেই। তবে মনে আছে, প্রতিটি বিষয়েই আমার মতামত জানিয়েছিলাম। পরে শুনেছি, যারাই তার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন, প্রত্যেককেই এ ধরনের প্রশ্ন করতেন।
প্রায় এক যুগ পার করে যখন জনবুদ্ধিজীবীর পরিচয় আর দায়দায়িত্ব নিয়ে লিখতে বসেছি আমার বেশ আলোচিত প্রবন্ধ ‘বুদ্ধিজীবী ও তার দায়ভার’, কেবল তখন বুঝেছি, ওইসব প্রশ্ন আর উসকানি দিয়ে স্যার আসলে একজন খাঁটি জনবুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মতো কিছুটা অগ্রসর মেলের লোকদের রাষ্ট্র, সমাজ ও সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন করা, ক্ষমতার সম্পর্কজাল ও তার কাজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল রাখা, নাগরিক অধিকার সম্পর্কে মনে করিয়ে দেওয়া এবং প্রয়োজনে রুখে দাঁড়ানোর মতো মনোবৃত্তি তৈরি করা—এই কাজগুলোই করছিলেন তিনি। এটিই একজন প্রকৃত জনবুদ্ধিজীবী বা গণবুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব। ‘বুদ্ধিজীবী ও তার দায়ভার’ প্রবন্ধটি যখন লিখি, তখন বাংলাদেশের সংখ্যাল্প কয়জন মানুষের নাম মনে পড়ছিল, তাদের একজন আহমদ ছফা, আরেকজন আমার শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
এরপর বহুবার স্যারের সান্নিধ্যে গেছি। তার তত্ত্বাবধানে এমফিল করেছি। নানা বিষয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে, আলাপ-বাহাস হয়েছে। যত কথা হয়েছে তত আগের ধারণাই পোক্ত হয়েছে যে, আবুল কাসেম ফজলুল হক বুদ্ধিবৃত্তিক দায় পালনে পিছপা হননি।
জগৎ ও জীবনের বিচিত্র বিষয় নিয়ে ভেবেছেন তিনি। লিখেছেনও অনেক। অনুবাদ সম্পাদনাসহ তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিরিশের কাছাকাছি। এর মধ্যে উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য (১৯৭৯), মাও সেতুঙের জ্ঞানতত্ত্ব (১৯৮৭), বাঙলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্য (১৯৮৯), আশা-আকাঙ্ক্ষার সমর্থনে (১৯৯৩), সাহিত্যচিন্তা (১৯৯৫), বাঙলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা (১৯৯৭), সংস্কৃতির সহজ কথা (২০০২), রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ (২০০৮), শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ (২০১১) প্রভৃতি বই সিরিয়াস পাঠকের চিন্তাচর্চার সঙ্গী হয়েছে।
ড. আহমদ শরীফ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীল চিন্তার বিদ্বৎসভা ‘স্বদেশ চিন্তা সংঘ’। সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস ও সংস্কৃতির গঠনমূলক পর্যালোচনার লক্ষ্যে এই সংঘটি গঠিত হয়। আহমদ শরীফ মারা যাওয়ার পর অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। বহুদিন ধরে লোকায়ত পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন। মোটকথা জীবৎকালে তার চিন্তা, শ্রম ও মেধা নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যাপৃত থেকেছে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চায়, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল মানবতার মুক্তি।
আধুনিক জ্ঞান, যুক্তিবাদ ও প্রকৃত প্রগতিশীলতার নিরিখে চালিত হয়েছে তার চিন্তাধারা। যৌবনে মার্কসবাদী রাজনৈতিক চিন্তার সংস্পর্শে আসেন। সেজন্য তার চিন্তায় সমাজতান্ত্রিক দর্শনের গভীর প্রভাবও বোঝা যায়। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন সারা জীবন। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে আধিপত্যকামী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইউরোপীয় পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচক ছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি মনে করতেন মধ্যপ্রাচ্যের সব সমস্যার কারণ হলো ওখানকার দেশগুলোয় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। এজন্য লেখাজোকায় ও বক্তৃতায় তিনি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তুলে নেওয়ার বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। তিনি মনে করতেন, দুনিয়ার প্রতিটি দেশের মানুষদের উচিত এ বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা। এই যে, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে তার উদ্বেগ, সেটিও ছিল মধ্যপ্রাচ্যবাসী সাধারণ ব্যক্তির জন্য। এসব কারণে তাকে লিবারেল হিউম্যানিস্ট হিসেবে দেখেন অনেকে।
তার চিন্তার ভিত্তি হিসেবে জাতীয়তাবাদী উপাদানও সক্রিয় ছিল। এসব কিছু নিয়ে চিন্তক হিসেবে তার যে ভাবমূর্তি সেটিকে আমি একজন জনবুদ্ধিজীবীর ভাবমূর্তি হিসেবেই দেখি। বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী কথাটার এত অপব্যবহার হয়েছে যে, এর তাৎপর্য প্রায় নষ্ট হওয়ার পথে। অমেধাবী লেখক, স্বার্থান্বেষী সাংবাদিক, এমনকি দলীয় প্রচারকর্মী টকশোওয়ালাদেরও নির্বিচারে বুদ্ধিজীবী বলে ডাকা হয়। দলীয় প্রচারকর্মী সব সময়ই দলের পক্ষে প্রচার করেন, জনমত গঠনে সাহায্য করেন। এজন্য তিনি প্রকাশ্যে বা গোপনে লাভবানও হন। তাকে প্রচারকর্মী হিসেবেই দেখা উচিত। অথচ এই দেশে এদেরও বলা হয় বুদ্ধিজীবী।
প্রকৃত বুদ্ধিজীবী তিনিই যিনি দল ও গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ জনসমাজের কোনো মনোভাব, মতামত, দর্শন তার লেখায় রূপায়িত করেন এবং তার প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি ব্যক্তির অধিকার বিষয়ে সোচ্চার থাকেন, সে অধিকার রক্ষায় প্রয়োজন হলে ক্ষমতার মুখের ওপর কথা বলেন। এই আলোকে বাংলাদেশে অল্প কয়েকজনকে আমরা বুদ্ধিজীবী বলে অভিহিত করতে পারি। আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন তাদের একজন। তিনি রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করেছেন সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় ও তার যথাযথ বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য। সরকার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে ভেবেছেন, কথা বলেছেন সেই ব্যক্তির স্বার্থেই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রত্যক্ষ উপনিবেশের বদলে চিন্তা ও সংস্কৃতির আধিপত্যের পিঠে চড়ে একটা দেশ কর্তৃক আরেক দেশে আর্থ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ করার কূটকৌশল চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন শক্তি। সেটিকে বলা হয় নয়া-ঔপনিবেশিক আগ্রাসন। এই বিষয়টি নিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল কথা বলেন সেই নব্বই দশকের শুরুতেই (দ্রষ্টব্য: তার ‘আশা-আকাঙ্ক্ষার সমর্থনে’ বইয়ের প্রবন্ধ ‘মানবতাবাদ ও মানুষের অধিকার’)। অন্যত্র তিনি ইঙ্গিত করেছেন কোনো একটি দেশে নয়া ঔপনিবেশিক আগ্রাসনে সহযোগিতা করে সেই দেশটিরই কিছু শক্তি। অনেক লেখায় পরিষ্কার বলেছেন আমেরিকা ও ইউরোপের শক্তিগুলোর নয়া ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের কারণে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার থেকে ফায়দা লোটে দেশের বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, এনজিও, সিভিল সোসাইটি—এরা।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন মুক্তবুদ্ধির মানুষ। তার বহু লেখায় সেটি প্রকাশ পেয়েছে। যেমন, বাংলাদেশের মতো দেশে স্বৈরতন্ত্রের উত্থানে নেতার প্রতি জনগণের অতিমাত্রার ভক্তি এবং মোসাহেবদের মোসাহেবিকেও দায়ী মনে করেন। আমি মনে করি, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যবেক্ষণ। আমাদের এক জীবনেই আমরা বারবার দেখছি নেতারা ক্ষমতাসীন হলে প্রাপ্তির আশায় কিছু মোসাহেব নেতাদের অতিমাত্রায় প্রশংসা করে, তেলমর্দন করে। আবার সাধারণ মানুষদের অনেকেও নেতাকে অন্ধভাবে ভক্তি করে। এর ফলে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয় যখন ক্ষমতাসীন মানুষটি জনমতের প্রকৃত অবস্থা বুঝতেই পারেন না। মোসাহেবি, তেলবাজি, আর বিপুল ভক্তিতে অন্ধ হয়ে মনে করেন তার প্রতি জনগণের শতভাগ সমর্থন রয়েছে। এ অবস্থায় কেউ একজন তার সামান্য সমালোচনা করলেও তিনি প্রতিক্রিয়া করেন, মনে করেন সেই মানুষটিই তার আসল শত্রু, ষড়যন্ত্রকারী। এভাবে বাংলাদেশে বারবার নিরঙ্কুশ একনায়কত্ব কায়েম হয়েছে। পরিণামে ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়ন-শোষণের শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ।
প্রশংসা আর ভক্তির আধিক্যের প্রবণতা তিনি চিহ্নিত করেছেন সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার ক্ষেত্রেও। তার ভাষায়, ‘রবীন্দ্রনাথের অন্ধভক্তদের মধ্যে রবীন্দ্রপূজার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। পাল্টা নজরুল পূজার আয়োজনও লক্ষ করা যাচ্ছে। ভক্তদের সঙ্গে ধূর্তরা মিলেছে।...মার্কসবাদের কাঠমোল্লাদের আচরণ ও প্রবণতাও সম্পূর্ণরূপে সৃষ্টিবিরোধী, আর সুবিধাবাদী ধূর্তরা সভ্যতার পরিপন্থী কাজে লিপ্ত। (দ্রষ্টব্য : ‘প্রতিভা ও নেতৃত্ব’, আশা-আকাঙ্ক্ষার সমর্থনে)।
সমস্ত তত্ত্ব-জ্ঞানভাষ্য-দল-গোষ্ঠীর প্রভাববলয় থেকে দূরে দাঁড়িয়ে, মানুষ ও তার মানবিক অধিকারকে কেন্দ্রে রেখে রাষ্ট্র ও সমাজকে পর্যবেক্ষণে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই এমন যথার্থ নিরপেক্ষ ও নির্মোহ উপলব্ধিতে পৌঁছতে পেরেছিলেন তিনি। মানুষের প্রয়োজনে, আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে, সাধারণ মানুষের স্বার্থেই এমন নির্মোহ দৃষ্টি ও বিচারিক ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। তিনি চাইতেন সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও শোষণ-নির্যাতনহীন অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাষ্ট্র। এজন্য ‘বাংলাদেশের মুক্তি ও উন্নতির কর্মনীতি’ শিরোনামে ২৮ দফার একটি কর্মরেখা প্রণয়ন করেছিলেন। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন এবং পরিবারতন্ত্র ও অর্থসর্বস্ব রাজনীতির অবসানের লক্ষ্যে তিনি ২৮ দফা প্রস্তাব করেন। এসবই তার বিচিত্রমুখী তৎপরতার ফসল। সাধারণ মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সারা জীবন বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে ব্যাপৃত থাকা এই জনবুদ্ধিজীবীর মৃত্যুতে তার স্মৃতি ও কর্মের প্রতি আমাদের অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।