হোম > সাহিত্য সাময়িকী > গদ্য

হজের টুকরো স্মৃতি

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

হজের মৌসুম এলে কাজী গোলাম রহমান স্যারের কথা মনে পড়ে। তিনি খাজা সারওয়ার স্যারের বন্ধু ছিলেন। খাজা গোলাম সারওয়ার ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য। কঠিন মানুষ।

২০০১-এর ডিসেম্বর। একদিন খাজা সারওয়ার স্যার বললেন, শুনলাম আপনি আবার হজ করবেন?

আমি বললাম, ছুটি চেয়েছি স্যার।

আমার একজন বন্ধু হজে যেতে চান। আপনি তাকে সঙ্গে নেবেন? তার নাম কাজী গোলাম রহমান।

আমার জানা ছিল না, কাজী গোলাম রহমান স্যার কিছু দিন আগেও এনএসআইয়ের ডিজি ছিলেন। তার আগে পিডিবির চেয়ারম্যান। তিনি ১৯৬৭ ব্যাচের পুলিশ সার্ভিসের সদস্য। অ্যাডিশনাল আইজি হয়েছিলেন। তার ভাই কাজী ফজলুর রহমান ১৯৫৬ ব্যাচের সিএসপি।

একদিন কাজী গোলাম রহমান স্যার আমাদের বাংলা মোটরের অফিসে এলেন। পরিচয় হলো। কয়েক দিন পর আবার এলেন; বললেন, আমার স্ত্রীকে নিয়ে হজে যেতে চাই। তিনি রাজি হচ্ছেন না। আমার ওপর ভরসা নেই। আপনি বাসায় আসেন। আপনার সঙ্গে আলাপ করলে তিনি রাজি হয়ে যাবেন।

অবিশ্বাস্য কথা। যাই হোক বললাম, যাব স্যার।

এক সন্ধ্যায় ভাবি ডিনার করালেন। কথাবার্তা হলো। হজে যেতে রাজি হলেন। একটি শর্ত আছে─মক্কা-মদিনায় বাসায় টয়লেটে কমোড থাকতেই হবে। ভাবির হাঁটু ভাঁজ হয় না।

আমাদের দল হলো আটজনের। মুবারক মোল্লা স্যারেরও হাঁটুতে সমস্যা। তিনিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ছিলেন।

মদিনা পৌঁছে বাস থেকে নেমে খুঁজে খুঁজে আমরা এমন বাসা নিলাম, যেখানে টয়লেটে কমোড আছে। কিন্তু মক্কার বাসা আমাদের হাতে নেই। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ট্রাভেল এজেন্ট বাসা ভাড়া করে রেখেছে। ভোর ৪টায় মক্কা পৌঁছে দেখি ভাড়া করার বাসার বাথরুমে স্কোয়াটিং প্যান। স্বাভাবিকভাবেই সংশ্লিষ্ট সবার মন খারাপ হলো।

কাজী গোলাম রহমান স্যার গম্ভীর মুখে বললেন, ফয়জুল লতিফ, একটা কিছু করেন।

আমি বললাম, স্যার, সারা রাত জার্নি করেছেন। এখন ফজর পড়ে বিশ্রাম নিন। তারা চিন্তিত মুখে বিশ্রাম নিতে গেলেন।

ভোর ৬টার কাছাকাছি। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমি দুশ্চিন্তিত মুখে বাসার গেটে এসে দাঁড়ালাম।

আল্লাহপাকের দয়ায় গেটে দাঁড়িয়ে থেকেই পনেরো মিনিটের মধ্যে প্লামার পাওয়া গেল। তাকে ডেকে নিয়ে এলাম। বাথরুম প্রশস্ত। প্যান তুলে কমোড বসাতে হবে। ফ্লোর নতুন করে করতে হবে। বাথরুমের দেয়ালে টাইলস বসাতে হবে। ট্যাপ কক, শাওয়ার, আয়না আর যা যা সম্ভব বদলে দিতে হবে। দ্রুত সব কাজ করতে হবে।

হাজা বিকাম?

মিয়া ওয়া খামসিন রিয়াল? – ১৫০০ রিয়াল।

আমার সুটকেসে কত আছে দেখতে গেলাম। কাজী গোলাম রহমান স্যার ঘুমের মধ্যে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো গতি হয়েছে?

অনেক টাকা লাগবে, স্যার।

কত?

১৫০০ রিয়াল।

ঘুমাতে ঘুমাতে তিনি পাঞ্জাবির পকেট থেকে এক গোছা টাকা বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

সকাল ৯টার দিকে কাজ শেষ হলো। আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ।

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, খালাস?

সে হেসে বলল, কুল্লু খালাস।

মিস্ত্রিকে টাকা দিলাম। সে ঘড়ি দেখিয়ে বলল, ১০টার আগে যেন পানি ব্যবহার করা না হয়।

যেমন শুনলাম, তেমন করব।

১০টার দিকে ঘুম থেকে সবার আগে উঠলেন কাজী গোলাম রহমান স্যার। ঝকঝকে নতুন বাথরুম-টয়লেট দেখে বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন; কিছু বললেন না।

জোহরের নামাজ পড়ে বাসায় এসেছি। তিনি শসা কাটছেন খুব কায়দা করে, লাঞ্চের ব্যবস্থা হতে আরো কিছু দেরি। শসা এগিয়ে দিয়ে বললেন, “খাও। আর ‘আপনি’ বলা যাবে না তোমাকে। এখন থেকে তুমি ছোট ভাই। তোমার ভাবি বলেছেন।”

মদিনা থেকে মক্কা আসার সময় মিকাতে অজু করার সময় আমার ঘড়িটা হারিয়ে ফেলি। ভাবি একশ রিয়েলের নোট দিয়ে বললেন, ‘আজ আসরের পর একটা ঘড়ি নিয়ে এসো। তোমার হাতে ঘড়ি থাকা দরকার।’

মিনায় যাওয়ার রীতি মক্কায় ফজরের নামাজ পড়ে। ভিড় এড়ানোর জন্য ইদানীং বহু মানুষ এশার পরই রওনা হতে দ্বিধা করে না। আমরা কাবা শরিফে ফজরের নামাজ আদায় করে, বাসায় গিয়ে মাল-সামান সংগ্রহ করে, তারপর রওনা করলাম মিনার পথে। কী করে যাই? আমাদের জন্য নির্দিষ্ট বাস তো আগের রাতে চলে গেছে। হারাম শরিফের কাছে অনেকক্ষণ রাস্তার ধারে অপেক্ষা করার পর একটি খালি জিইএম ভ্যানের দেখা পাওয়া গেল। টাকার প্রশ্ন। আমি কাজী গোলাম রহমান স্যারের মুখের দিকে তাকালাম। তিনি নিঃশব্দে সম্মতি জানালেন। আমি হাত নেড়ে ভ্যান থামালাম। ড্রাইভারের বয়স ১২-১৩ হবে। সঙ্গীর বয়স ১০-১১ হতে পারে। আমি তাঁবুর নম্বর দেখালাম। পিচ্চি মাথা নেড়ে বলল, সমস্যা নেই। তবে সে অনেক টাকা চাইল। কাজী গোলাম রহমান স্যার ভাবির দিকে দিকে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘এসি আছে?’ ‘আছে।’

তিনি তার মালপত্র নিয়ে ভ্যানের দরজার দিকে অগ্রসর হলেন। অল্পক্ষণেই শান্তিমতো মিনায় আমাদের তাঁবুর কাছে পৌঁছে গেলাম। তাঁবুর ভেতরে শাড়ি ঝুলিয়ে মহিলাদের থাকার ব্যবস্থা পৃথক করা।

মিনায়, আরাফায় ও মুজদালিফায় আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। আল্লাহপাকের অশেষ দয়া।

আরাফার মাঠে জোহরের নামাজ আদায় করে খোলা প্রান্তরে গিয়ে মাথার ওপর প্রখর সূর্যের তাপবর্ষণ নিয়ে দুই হাত তুলে মোনাজাত করতে থাকলাম যতক্ষণ সম্ভব হয়। আলহামদুলিল্লাহ।

আরাফার মাঠে সারা দিন থেকে, এবাদত ও দোয়া করে মুজদালিফার পথে রওনা হওয়া। নিয়ম হলো মাগরিবের আজান শুনে—নামাজ না পড়ে—বাসে উঠতে হবে। আজকাল বহু মানুষ আসরের পরেই রওনা হয়ে যায়। তবে আমরা নিয়মের ব্যত্যয় করলাম না। মাগরিবের আজান হলো। তারপর আমরা বাসে উঠলাম। দূরত্ব বেশি নয়, লাখো লোক পায়ে হেঁটে যায়। ভিড়ের কারণে মুজদালিফার মাঠে পৌঁছুতে অনেক দেরি হলো। বাস থেকে নেমে একটা খালিমতো জায়গা দেখে সবাই মাদুর বিছিয়ে মালপত্র রাখলাম। তারপর অজু করে জামাতে মাগরিবের নামাজ পড়লাম। মাগরিবের তিন রাকাত ফরজের পর এশার ফরজ চার রাকাত। সেটাই নিয়ম। মাওলানা শরীফুল ইসলাম ইমামতি করলেন। ফরজের পর মাগরিবের ও এশার সুন্নত। তারপর কঙ্কর সংগ্রহ করা; পানিতে ধুয়ে থলেতে রাখা।

পরদিন ফজরের নামাজ আদায় করে পায়ে হেঁটে মিনায় প্রত্যাবর্তন। সবই হলো মসৃণভাবে। আলহামদুলিল্লাহ। শুরু হলো হজের তৃতীয় দিন (১০ জিলহজ)। দুপুরের দিকে জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করে মাথা কামিয়ে ফেলব। নাপিতের অভাব নেই। হাদিয়া পাঁচ কি দশ রিয়াল। কিন্তু মস্তক মুণ্ডন করতে হবে কোরবানি হয়ে যাওয়ার পরে । কোরবানির জন্য ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। আনুমানিক বেলা ১২টা থেকে ২টা নাগাদ কোরবানি হয়ে যাওয়ার কথা। মাওলানা শরীফুল ইসলামের পরামর্শে আমরা বিকাল ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে নাপিতের পিঁড়িতে গিয়ে বসলাম।

হজের তৃতীয় দিনে কাবা শরীফ প্রদক্ষিণ করা বা তাওয়াফ করাকে বলে তাওয়াফে ইফাদাহ বা তাওয়াফে জিয়ারত। সন্ধ্যার দিকে আমরা দুজন করে জোড় বেঁধে তাওয়াফ করতে নেমেছি। আমি আর মাওলানা শরীফুল ইসলাম একসঙ্গে ৮টা নাগাদ তাওয়াফ সেরে বাইরে এসে চা খেয়ে হারাম শরিফের বহিরাঙ্গনে পূর্বনির্ধারিত মিটিং পয়েন্টে অপেক্ষা করছি। সময় চলে যাচ্ছে। রাত সাড়ে ৯টা বেজে গেছে। আর কারো দেখা নেই। রাত ১০টার দিকে কাজী গোলাম রহমান স্যার এবং ভাবির সঙ্গে দেখা।

মুখ গম্ভীর। বললেন, চল এখন মিনায় ফিরে যাই। কী ভাবে যাব?

তাওয়াফ হয়েছে, স্যার? সমস্যা হয়নি তো?

ভারী গলায় বললেন, না। এত ভিড়ের মধ্যে তাওয়াফ সম্ভব নয়। চল মিনায় ফিরে যাই।

মুবারাক মোল্লা স্যার ও তার সঙ্গীরও একই অবস্থা—ভিড়ের কারণে তাওয়াফ করতে পারেননি।

এটা ফরজ কাজ, স্যার। সময় নির্দিষ্ট। এখন তাওয়াফ করতেই হবে।

আমি মুবারাক মোল্লা স্যারকে নিয়ে আবার তাওয়াফ শুরু করলাম। মাওলানা শরীফুল ইসলাম গেলেন কাজী গোলাম রহমান স্যার ও ভাবিকে নিয়ে। আল্লাহপাকের দয়া, ঘণ্টা খানেকের মধ্যে তাওয়াফ সম্পন্ন হলো। আলহামদুলিল্লাহ। বাসায় গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে মিনায় ফিরলাম। আমার দুবার তাওয়াফ হয়ে গেল।

হজের শেষ দিন। পঞ্চম দিবস। তৃতীয় দিনের মতো কঙ্কর নিক্ষেপ করে তাঁবুতে ফিরে এসেছি। ২২ কি ২৬ লাখ মানুষ প্রায় একসঙ্গে মিনা থেকে মক্কায় ফিরে যাবে। তাদের মধ্যে আমরা আটজন। তবে আমাদের মালসামান একটু বেশি।

কাজী গোলাম রহমান স্যার বললেন, ফয়জুল লতিফ, এত মালসামান! আমরা সবাই ক্লান্ত। তোমার ভাবি তো কিছুই টানতে পারবে না। কুলিটুলি পাওয়া যাবে না?

মিনায় কুলি? এই অসম্ভব প্রস্তাব শুনে একই সঙ্গে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হলাম।

শান্ত স্বরে বললাম, এই জনসমুদ্রে কুলি কোথায় পাব, স্যার?

একটু দেখো না।

তাঁবু থেকে বের হয়ে ১০০ ফুট হেঁটে সংলগ্ন রাস্তার কাছে দাঁড়ালাম। দশ মিনিটও হয়নি, দেখি তুই কাল্লু (পরে জেনেছি সুদানের মানুষ) দুটি ট্রলি নিয়ে হাজির হয়ে গেল। এয়ারপোর্টে যেমন থাকে, সেরকম মাল টানার ট্রলি। বড় বড় চাকা।

হাম্মাল?

দুজনে একসঙ্গে ঘাড় দুলিয়ে বলল, নায়াম।

আমি মনে মনে বললাম, আলহামদুলিল্লাহ।

কত দিতে হবে জিজ্ঞেস করলাম না; বললাম, দুজনকেই লাগবে। দুজনকে নিয়ে তাঁবুতে গেলাম। ওরা বাস পর্যন্ত মাল টেনে দিল। দুজনকে তিরিশ-তিরিশ ষাট রিয়েল দিয়ে দিলাম।

ট্রলিসহ দুই কুলি দেখে সেই প্রথম দিনের মতো কাজী গোলাম রহমান স্যার বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন। কিছু বললেন না।

হজের গল্পের শেষ নেই। সংক্ষেপে কিছু বললাম।

আল্লাহপাক কাজী গোলাম রহমান স্যারসহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস মঞ্জুর করুন।

এক দুপুরে চার্লস ডিকেন্স