বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের দুটি লকার থেকে সম্প্রতি ৮৩২ ভরি স্বর্ণ পাওয়ার খবর জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক। এই ঘটনার পর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ভল্ট এবং লকার ব্যবহার ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
লকার ও ভল্টের মধ্যে পার্থক্য কী, গ্রাহকের অনুপস্থিতিতে তার লকার অন্য কেউ আনলক করতে বা খুলতে পারে কি না এই বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা চলছে।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভল্ট এবং লকারের মূল পার্থক্য এর ব্যবহারকারীর জন্য। ভল্ট ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো, আর লকার ব্যবহার করে এর গ্রাহকরা।
লকার ব্যবহার করার নিয়মকানুন ব্যাংক-কোম্পানি আইন ১৯৯১ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারণ হয়ে থাকে।
এছাড়া সরকারি বা বেসরকারি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকও মৌলিক নিয়মগুলো একই রেখে নিরাপত্তার খাতিরে তাদের মতো করে কিছু নিজস্ব নিয়মও যুক্ত করে।
বিভিন্ন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লকার আনলক বা খোলার ক্ষেত্রে গ্রাহক বা তার দ্বারা নির্ধারিত প্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। তবে আদালতের নির্দেশে অনেক সময় ব্যাংকের লকার জব্দ বা খোলার উদাহরণ রয়েছে।
সম্প্রতি আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের কয়েকজনের নামে দুটি ব্যাংকে থাকা লকার খোলা হয়। এর আগেও আদালতের নির্দেশে সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরীর লকার খোলা হয়েছিল।
যদিও হাসিনা এবং তার পরিবারের কয়েকজনের নামে থাকা লকার তাদের অনুপস্থিতিতে খোলা এবং সেখান থেকে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। তাদের প্রশ্ন, জব্দ হওয়া লকারগুলো এতোদিন পর হঠাৎ কেন খোলা হলো?
দুদকের মহাপরিচালক অবশ্য বলছেন, তদন্তের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়ে কিছুটা সময় লেগেছে। তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নিয়ম মেনেই লকারগুলো খোলা হয়েছে বলেই দাবি তার।
ভল্ট এবং লকারের পার্থক্য
ভল্ট হলো ব্যাংকের একটি সুরক্ষিত ও কেন্দ্রীয় স্থান যেখানে নগদ টাকা, মূল্যবান সম্পদ এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি রাখা হয়। অন্যদিকে, লকার হলো ভল্টের ভেতরে থাকা একটি ছোট, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বক্স, যা গ্রাহকরা ভাড়া নেন তাদের ব্যক্তিগত মূল্যবান জিনিস যেমন স্বর্ণ, দলিলপত্র ইত্যাদি রাখার জন্য।
ব্যাংকের সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ভল্ট। আর ভল্টের ভেতরে আলাদা রুমে থাকে লকার ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত মূল্যবান সামগ্রী নিরাপদ রাখতে ব্যাংকের সেফ ডিপোজিট লকার ব্যবহার করেন অনেকে। প্রতিটি ব্যাংকেই এই সুবিধা থাকে, তবে সব শাখায় নয়।
অন্যদিকে ভল্ট ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। এক্ষেত্রে সহজ ভাষায় বলতে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট হলো সরকারের মূল কোষাগার, আর অন্যান্য ব্যাংকের ভল্ট সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কোষাগার যেখানে অর্থ বা সম্পদ রাখার পরিমাণ নির্দিষ্ট।
ভল্টের সীমা অতিক্রম করলে নিয়ম অনুযায়ী বাড়তি অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখায় (সোনালী ব্যাংকের যে শাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবর্তে কাজ করে) রাখতে হয়।
অগ্রণী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল বাশার বলছেন, লকার খোলার ক্ষেত্রে দুটি চাবির প্রয়োজন হয়, যার 'মাস্টার কি' থাকে ব্যাংকের কাছে এবং অন্যটি থাকে গ্রাহকের কাছে। দুটি চাবি একসাথে ব্যবহার করেই কেবল লকারটি খোলা বা বন্ধ করা যায়।
অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় লকার ব্যবহারের সময় সেখানে গ্রাহক ছাড়া অন্য কেউ থাকার সুযোগ পান না। একক বা যৌথভাবেও লকার ভাড়া নেওয়া যায় এবং গ্রাহক নিজের পছন্দ অনুযায়ী ব্যক্তিকে নমিনি করতে পারেন।
বাশার বলছেন, "যেখানে লকার থাকবে সেখানে সিসি ক্যামেরাও থাকার সুযোগ নেই। প্রতিবার প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় তার হিস্ট্রি নির্দিষ্ট লকবুকে নথিভুক্ত থাকে।"
সাধারণ গ্রাহকরা নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করে বাণিজ্যিক ব্যাংকের লকার ব্যবহার করতে পারেন। লকার নেওয়ার সময় নির্দিষ্ট একটি ফরম পূরণ করে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। এক্ষেত্রে লকার থেকে কোনো সম্পদ গায়েব হলে গ্রাহক ক্ষতিপূরণ কীভাবে পাবে সেটিরও নিয়ম নির্ধারণ করা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকেও লকার সিস্টেম রয়েছে তবে সেটি ব্যবহারের সুযোগ পান ওই ব্যাংকের কর্মকর্তারা। যদিও নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় এই সুযোগ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা।
লকার কি যে কেউ খুলতে পারে?
সাধারণত লকার খোলার ক্ষেত্রে গ্রাহক বা তার মনোনীত প্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কারণ গ্রাহকের কাছে থাকা চাবি ছাড়া লকারটি খোলা সম্ভব নয়। এছাড়া একান্ত ব্যক্তিগত হওয়ায় লকারে থাকা সম্পদের নিরাপত্তা এবং এর জবাবদিহি নিশ্চিতের বিষয়টিও রয়েছে।
এই যেমন সম্প্রতি শেখ হাসিনার সঙ্গে তার বোন শেখ রেহানা, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদসহ পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা অগ্রণী ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের লকারগুলো থেকে ৮৩২ ভরি স্বর্ণ পেয়েছে দুদক।
এক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, গ্রাহকের অনুপস্থিতিতে লকারের ভেতরে থাকা সম্পদের সঠিক হিসাব দেওয়া হচ্ছে কি না। এছাড়া জব্দ হওয়া সম্পদের পরিমাণ ফলাও করে প্রচার করার পেছনে রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না এমন প্রশ্নও উঠছে।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল বাশার বিবিসি বাংলাকে বলছেন, শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের কয়েকজনের নামে থাকা লকারগুলো খোলার ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা মানা হয়েছে। এক্ষেত্রে নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছেন তারা।
"এটি একটা অন্য পরিস্থিতি। সরকার চাচ্ছে, আদালতের বিষয় এখানে তো ব্যাংকের কিছু করণীয় নেই," বলেন তিনি।
প্রয়োজনীয় আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই লকারগুলো খোলা হয়েছে বলে মনে করে এই মামলার তদন্তকারী সংস্থা দুদক। তারা বলছে, "আইনগতভাবে এক্ষেত্রে কোনো অস্বচ্ছতা নেই, তা না হলে তো দুদক একাই এটা করতে পারতো।"
দুদক মহাপরিচালক আক্তার হোসেন বলছেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী লকারগুলো খুলেছেন তারা। এসময় একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, অনুসন্ধান তদারক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনীত একজন স্বর্ণ বিশেষজ্ঞ, এনবিআরের কর গোয়েন্দা ও সিআইসি মনোনীত দুজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট শাখার ব্যাংক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দের প্রায় দেড় বছর পর লকারগুলো খোলা হলো কেন এমন প্রশ্নের জবাবে দুদক মহাপরিচালক বলছেন, "আমাদের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা আদালতে আবেদন করেছেন তার প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত আদেশ দিয়েছেন। সবকিছু একটা প্রসিডিওরের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় একটু সময় লেগেছে।"
অতীতেও এমন ঘটনার উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরীর বাংলাদেশ ব্যাংকের লকার থেকে স্বর্ণ, নগদ ডলার, ইউরোর মতো সামগ্রী উদ্ধার করে তা জব্দ করা হয়েছিল। সেবারও লকারটি খোলার আগে আদালতের আদেশ আনতে হয়েছিল দুদক কর্মকর্তাদের।
এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোর্শেদ বলছেন, আদালতের নির্দেশনা থাকলে ব্যাংকের লকার খোলার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে না।
তবে তদন্তাধীন একটি বিষয় গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন মি. মোর্শেদ। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও এমন প্রচারণা হয়ে থাকতে পারে।
" হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া এখনো চলমান, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও হিসাবও জব্দ। তাহলে হঠাৎ এখন কেন লকারগুলো ভাঙার প্রয়োজন হলো? এখানে রাজনীতি আছে," মনে করেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা