কৃষি খামারে কর্মরত অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ, দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ফার্ম শ্রমিক ফেডারেশন (বিএএফএলএফ)। সংগঠনটি নিয়মিত শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১ হাজার ২৫০ টাকা এবং অনিয়মিত শ্রমিকদের ১ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে।
রোববার বেলা্ ১১টার দিকে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি আজিজুল হক ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম ছরোয়ার উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাধারণ সম্পাদক।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা খামার, বীজ উৎপাদন খামার, বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, নার্সারি, হর্টিকালচার সেন্টার ও উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন কৃষি উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকেরা দীর্ঘদিন ধরে কৃষি গবেষণা, মানসম্মত বীজ ও কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের অধীন সংশ্লিষ্ট খামার ও প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকেরাও উৎপাদন কার্যক্রমে অবদান রাখছেন। কিন্তু তাদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির দাবি, ‘কৃষি ফার্ম শ্রমিক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা-২০১৭’ অনুযায়ী অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণের সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। নীতিমালার ২(ছ) ধারায় নিয়মিত পদে কাজের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োগ না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ৩ নম্বর ধারায় কোনো প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্নভাবে কমপক্ষে তিন বছর কাজ করা এবং বছরে ২৪০ দিন কর্মরত অনিয়মিত শ্রমিকদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নিয়মিত করার সুযোগ রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
ফেডারেশনের অভিযোগ, ২০০২ সালের পর থেকে বিএডিসি কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় ধরে এসব বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। অথচ বিএডিসির খামারগুলোতে সারা বছরই নিয়মিতভাবে বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হয়। এসব কাজে দীর্ঘদিন ধরে অভিজ্ঞ ও দক্ষ শ্রমিকেরা নিয়োজিত থাকলেও তাদের নিয়মিত করা হচ্ছে না।
শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র না দেওয়ার অভিযোগ তুলে সংগঠনটি বলেছে, এতে শ্রমিকদের আইনগত অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিক হিসেবে কাজ করায় তারা বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ফেডারেশনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয় একটি অফিস আদেশ জারি করে। ওই আদেশে বিএডিসিতে কর্মরত অনিয়মিত শ্রমিকদের ‘কৃষি ফার্ম শ্রমিক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা-২০১৭’ অনুযায়ী নিয়মিতকরণের ব্যবস্থা নিয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বিএডিসির চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সংগঠনটির অভিযোগ, এখন পর্যন্ত ওই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলা হয়, সর্বশেষ ২০২০ সালে কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও মজুরি বাড়েনি। এ সময়ে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকেরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ফলে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে ১৩ দফা দাবি জানানো হয়, দাবিগুলো হলো—
১. বিএডিসিসহ সব গবেষণা খামারে কর্মরত অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরের আদেশ দ্রুত বাস্তবায়ন।
২. নিয়মিত শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১ হাজার ২৫০ টাকা এবং অনিয়মিত শ্রমিকদের ১ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ।
৩. চাকরি বা নিয়োগের অবসানে পূর্ণ কর্মবছরপ্রতি ৬০ দিনের মজুরির সমপরিমাণ আর্থিক সুবিধা প্রদান।
৪. কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড চালু।
৫. বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে 'কৃষি ফার্ম শ্রমিক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা' সংশোধন করে আইনি ভিত্তি প্রদান।
৬. নারী কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের পূর্ণ বেতনে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান।
৭. কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন।
৮. প্রতি হেক্টরে শ্রমিকের সংখ্যা সাতজন নির্ধারণ।
৯. প্রত্যেক শ্রমিককে ৩০ দিনের মজুরির অর্ধেকের সমপরিমাণ নববর্ষ ভাতা প্রদান।
১০. পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকদের দৈনিক মজুরির ৫০ শতাংশ হারে পাহাড়ি ভাতা প্রদান।
১১. সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু।
১২. স্বাস্থ্যবিমাসহ চিকিৎসা ভাতা চালু।
১৩. কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ও অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের পোষ্যদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান।