ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভোট সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে প্রশংসিত হয়েছে সেনাবাহিনী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তারা কোনো ছাড় দেননি। ভোটের মাঠে নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বিভিন্ন মহলের প্রশংসায় ভাসছেন সেনাসদস্যরা। এদিকে সেনাবাহিনী দ্রুতই ব্যারাকে ফিরে যাবে বলে জানা গেছে।
জুলাই বিপ্লবের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সেনানিবাস থেকে বের হয়ে মাঠে দায়িত্ব পালন করা শুরু করে সেনাবাহিনী। প্রায় এক বছর ছয় মাস ধরে ‘ইন অ্যাইড টু সিভিল পাওয়ার’ এর আওতায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহযোগিতা করেন সেনাসদস্যরা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যখন সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক ছিল, থানাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ এবং পুলিশ যখন নিরাপত্তার অভাবে থানায় যায়নি; ওই সময় ঢাকাসহ সারা দেশে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচনের আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনসহ একাধিক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার, অস্ত্র উদ্ধার, কিশোরগ্যাং গ্রেপ্তার, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা, সড়ক আটকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিক্ষোভ করা লোকজনকে বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরানোসহ বেসামরিক প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছেন তারা। এসব কাজেরই প্রশংসা পেয়েছেন সেনা সদস্যরা।
জানা গেছে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলের তিনটি নির্বাচন সর্বমহলে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এবারের নির্বাচনে মানুষের নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারে বড় চ্যালেঞ্জ। সেনাসদস্যরা ভোটের মাঠে নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বিভিন্ন মহলের প্রশংসা পেয়েছেন।
সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, ভোটের মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তারা কোনো ছাড় দেননি। ভোটের পরিবেশকে সুষ্ঠু করতে তফসিল ঘোষণার পর থেকে তারা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযানে নামে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি বাড্ডা এলাকায় ২১টি অস্ত্রসহ স্থানীয় সন্ত্রাসী মেহেদী হাসানকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া যাত্রাবাড়ীর ধলপুর এলাকায় পৃথক অভিযানে দুটি বিদেশি পিস্তল, একটি রিভলভার, তিন রাউন্ড গোলাবারুদ, বিপুল মাদকদ্রব্য ও নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়। ভোটে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না হয়, এজন্য সতর্ক ছিলেন সেনাসদস্যরা। ভোটকেন্দ্র দখলরোধ, ব্যালট পেপার ছিনতাই ঠেকানো, ভোট গণনায় হট্টগোল ঠেকানো, ভোটকেন্দ্রে উৎসুক মানুষকে সরানো, নির্ভয়ে ভোট প্রদানে সাধারণ জনগণকে অভয় দেওয়াসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন তারা। এসব পরিস্থিতি খুব দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সামলেছে তারা।
সূত্র জানায়, নির্বাচনের দিন ভোটের পরিবেশ শান্ত রাখতে সেনানিবাসের কন্ট্রোল সেন্টার থেকে তদারকি করা হয়। এছাড়া নিরাপত্তা বাড়াতে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা মাঠে কাজ করেছে। পাশাপাশি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে টহল জোরদার করেছিলেন সেনাসদস্যরা।
জানা গেছে, সেনাবাহিনী দ্রুতই ব্যারাকে ফিরে যাবে। এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি-উদ-দৌলা চৌধুরী গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় আমার দেশকে জানান, ‘সরকার যখন চাইবে, তখনই সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে।’
জানা গেছে, ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং ভোটের পরে ঢাকাসহ সারা দেশের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলে সেনাবাহিনী। পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাবাহিনী। ভোটের দিন ওয়াকিটকিতে তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফোর্স পাঠানো এবং হট্টগোল হওয়ার আগেই সেখান থেকে জনতাকে সরিয়ে দিয়েছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
এছাড়া তারা নির্বাচনের আগে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানের ভোটকেন্দ্র, যাতায়াতের স্থল, ভোট গণনার স্থান ও সার্বিক চিত্রের তথ্য সংগ্রহ করে আগাম সতর্ক ছিল সেনাবাহিনী।
সূত্র জানায়, ভোটের দিন কিছু আসনে হট্টগোলের চেষ্টা করেছিল বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকরা। সেই পরিস্থিতি সেনাসদস্যরা পেশাদারিত্বের সঙ্গে সামলেছেন। এছাড়া ভোট সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনী সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়েছে। পাশাপাশি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ইন অ্যাইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম পরিদর্শন ও অসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি সেখানে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন। মতবিনিময়কালে সেনাপ্রধান নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন।
আইএসপিআর সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ নির্বাচনে প্রায় এক লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। পাশাপাশি নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার এবং বিমানবাহিনীর তিন হাজার ৭৩০ সদস্য মোতায়েন ছিল। সারা দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২টি জেলা ও ৪১১ উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোয় ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যাম্প থেকে নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান, চেকপোস্ট স্থাপন ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনী মোট ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র, দুই লাখ ৯১ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। এছাড়া ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে বেসামরিক প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছে। নির্বাচনের দিন সামরিক হেলিকপ্টারে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সরঞ্জাম পরিবহনে সহযোগিতা করেছে সেনাবাহিনী।