ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন রোহিঙ্গা ইস্যুকে বৈশ্বিক এজেন্ডায় চলমান রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রবেশের নবম বার্ষিকী উপলক্ষে আজ বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন এ প্রত্যয় ব্যক্ত করে। সংকটটি দশম বছরে পদার্পণ করায় তারা ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে।
যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপানসহ ১৬টি মিশনের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যেহেতু এই সংকট দশম বছরে পদার্পণ করছে, তাই আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে না যায়। মিশনগুলো জানায়, ‘আমরা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বরকে জোরালো করা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক সমর্থন বজায় রাখতে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে যাব।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, মিয়ানমার থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা প্রবেশের ৯ বছর পরও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এই বার্ষিকী উপলক্ষে দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতি ও কষ্টের মুখে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের স্থিতিশীলতা, সাহস ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানায় মিশনগুলো। একই সঙ্গে প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
মিশনগুলো মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকারের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করলেও বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনের অনুকূলে নয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এতে আরো বলা হয়, ‘দুঃখজনকভাবে, রাখাইনজুড়ে সংঘাত বাড়ছে এবং মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তীব্র হচ্ছে।’
বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে থাকা, বেসামরিক অবকাঠামোয় বিমান হামলা এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ত্রাণ ও বাণিজ্যের ওপর অবরোধ মানবিক পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে। এই অস্থিরতা বাংলাদেশ এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য অংশে আরও নতুন বাস্তুচ্যুতির জন্ম দিচ্ছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে গিয়ে মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটছে।
মিশনগুলো জানায়, বর্তমান এই পরিস্থিতি স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একেবারেই অনুকূল নয়। প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে একটি কৌশলগত, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির প্রয়োজন। এর জন্য বাস্তুচ্যুতির মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা তৈরি এবং মিয়ানমারে বৃহত্তর শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। তারা উল্লেখ করেন, সফল প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে তোলা প্রয়োজন, যা রাখাইনে তাদের ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং সমাজ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে।
কূটনৈতিক মিশনগুলো প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির উপায় খুঁজতে বাংলাদেশের সাথে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এমন পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত, তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে, যার মধ্যে তাদের স্বনির্ভরতা শক্তিশালী করার পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিবৃতিতে আরও জোর দেওয়া হয়, রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ কেবল মানবিক সহায়তা বজায় রাখার ওপরই নির্ভর করে না, বরং এই সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থার উন্নতির ওপরও নির্ভর করে।
মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে স্থানীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশি ও শরণার্থী-পরিচালিত সংস্থাগুলোর ভূমিকা বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে মিশনগুলো সমর্থন জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রোহিঙ্গাদের জীবন ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তগুলোর কেন্দ্রে অবশ্যই তাদের নিজেদের কণ্ঠস্বর থাকতে হবে।’