দেশে জঙ্গি তৎপরতা আছে কি নেই—এ প্রশ্নে সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বক্তব্যে উঠে এসেছে বিপরীতমুখী ভাষ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, দেশে জঙ্গি রয়েছে। তবে সরকার তা ‘শূন্যের কোটায়’ নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে। অবশ্য উভয়েই মনে করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিষয়টিকে রাজনৈতিক ফায়দার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে কোস্ট গার্ডের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে ‘উগ্রবাদী সংগঠনের’ হামলার বিষয়ে পুলিশ সতর্ক থাকলেও দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরেছি কিন্তু আমি ওই শব্দকে রিকগনাইজ করি না। আমাদের দেশে এরকম কোনো তৎপরতা নেই। পৃথিবীর সব দেশে রেডিক্যাল (চরমপন্থি) কিছু ফোর্স থাকে, ফান্ডামেন্টাল কিছু পলিটিক্যাল পার্টি থাকে—এগুলোতে আমরা ইউজড টু, এগুলো থাকে। কিন্তু সে বিষয়ে আপনি যে শব্দ উচ্চারণ করলেন, আমাদের দেশের বর্তমান কালচারে সেটা এখন আর নেই।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলের সময় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমানে বাংলাদেশে সেগুলোর অস্তিত্ব নেই।’
অন্যদিকে, একই দিন সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভিন্ন বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। জঙ্গি বিতর্কে দুই ধরনের চরম অবস্থানই বাস্তবসম্মত নয় উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের একটি প্রবণতা ছিল, এখনো আছে।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ‘জঙ্গি হামলার’ আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বলেছিলেন, দেশে আসলে জঙ্গি নেই। জঙ্গি আছে কি না—বর্তমান সরকার এ বিষয়ে কী মনে করে এবং নাশকতার ব্যাপারে সরকারের গোয়েন্দাদের কাছে কী ধরনের তথ্য আছে? কতখানি শঙ্কা রয়েছে সরকারের কাছে? মানে কতখানি ‘ম্যাসাকার’ হতে পারে? ব্রিফিংয়ের সাংবাদিকদের এসব প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে—সরকারের কাছে কতখানি তথ্য আছে, এটা বলা যাবে না।
এটা একটা সংবেদনশীল তথ্য। এ তথ্যটা গোপন থাকবে। কিন্তু যেটুকু তথ্য সরকার জানিয়েছে- এটা ফ্যাক্ট; বাংলাদেশে জঙ্গি আছে। কিন্তু এখানে দুটো এক্সট্রিম আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জঙ্গি সমস্যাকে তারা ক্ষমতায় থাকার একটা ন্যারেটিভ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তারা বলত, বাংলাদেশে জঙ্গি আছে, জঙ্গিরা সব দখল করবে। সুতরাং আমি নির্বাচন করলাম কি না দেখার দরকার নেই, আমাদের ক্ষমতায় রাখো। দ্যাট ওয়াজ আ ন্যারেটিভ। সে সময় জঙ্গি শব্দটা অতিরঞ্জিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যে সরকারের সময় ইন্টারিমের সময় এ আলাপ কেউ কেউ করার চেষ্টা করেছে যে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই, এটাও আরেকটা এক্সট্রিম। এটাও ভুল কথা।
উপদেষ্টার দাবি, বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিটেন্সি- জঙ্গিবাদ ছিল, আছে। সেটাকে আমরা আসলে মোকাবিলা করতে চাই। জনগণকে এটুকু বলতে চাই, এ ঝুঁকি এমন নয় যে এটার জন্য ভয় পেতে হবে। কিন্তু আমরা যদি কোনো একটা সংকটকে বা ডিজিজকে স্বীকার না করি, ওটার চিকিৎসা হবে না। সুতরাং আমরা এটাকে একেবারে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করব।
সাংবাদিকরা বলেন, ৫ আগস্টের পরে জেল থেকে অনেক কয়েদি বেরিয়ে গেছে, অনেক জঙ্গিও বেরিয়ে গেছে। তারা কি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংগঠিত হয়েছে? এর জবাবে উপদেষ্টা জাহেদ বলেন, কিছু মানুষ জেল থেকে বের হয়েছিলেন। এখন সরকারের নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে এগুলোকে কমব্যাট করবে। কারণ সরকারের জন্য এটা কোনো কমফোর্টেবল ব্যাপার নয়।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর এক সতর্কবার্তায় জানায়, নিষিদ্ধঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। এরপর দেশের বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্কবার্তার পর দেশজুড়ে জঙ্গির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
ডিসইনফরমেশন প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানে সরকার
ডিসইনফরমেশন (ভুল তথ্য) প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা বলেছেন, আমরা এটা নিয়ে শক্ত অবস্থানে যাব। মিডিয়াতে আমরা ডিসইনফরমেশন বেইজ ফটোকার্ড অ্যালাউ করব না। সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা এ সব কথা বলেন।
খাল খনন কর্মসূচির ব্যাপারে আলোচিত একটি ফটোকার্ডের কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা জাহেদ বলেন, একটা কথা খুব ইম্পর্ট্যান্ট, উই মাস্ট বি সিরিয়াস অ্যাবাউট দ্যাট, মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন সরকার টলারেট করবে না। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, সাংবাদিকতা সাংবাদিকতাই যেন হয়, প্লিজ।
জাহেদ উর রহমান বলেন, আমি চাই মিডিয়ায় আরো বেশি সরকারের সমালোচনা, যৌক্তিক সমালোচনায় ভাইব্রেন্ট হয়ে উঠুক। আমি জানি না কবে কোন সরকার থেকে কেউ এ ধরনের কথা বলেছে। কিন্তু প্লিজ মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন নয়।
হামের টিকা পেয়েছে ৯৪ লাখ শিশু
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ জানান, দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন চলমান রয়েছে। গত সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯৪ লাখ ২৩ হাজার ৭৯৯ জন শিশু টিকা পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আরো বলেন, বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের ফলে গত দুই মাসে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। গত বছরের তুলনায় সীমান্তে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনে অপরাধী গ্রেপ্তারের হার প্রায় ৭০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্ত হত্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। মাদক ও চোরাই পণ্য জব্দ অভিযানের সফলতা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, জাতীয় সম্পদ রক্ষায় বিজিবি প্রায় এক লাখ লিটার জ্বালানি তেল (ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল) পাচার রোধে সক্ষম হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি সাফল্য। পাশাপাশি মানব পাচার প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনি প্রয়োগের ফলে এ খাতে ২৫ শতাংশ ইতিবাচক উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, ২৬ এপ্রিল সারা দেশে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫২ মেগাওয়াট, সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৪৮৭ মেগাওয়াট এবং ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৮৬৫ মেগাওয়াট। ২৬ এপ্রিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ময়মনসিংহ জোনে ৩ ঘণ্টা।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, দেশে এক লাখ ৭০ হাজার ৯৬৪ মেট্রিক টন ডিজেল মজুত রয়েছে। আরো এক লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আসবে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে। এছাড়া অন্যান্য জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।