সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০ গ্রেডে নিয়োগের পরীক্ষাপদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সরকার। নতুন বিধিমালায় গ্রেডভেদে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে ‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাগুলোর ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মানবণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ১৩ সদস্যের এ কমিটি প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সংস্থা।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় ১১ থেকে ২০ গ্রেডের পদগুলোকে তিনটি স্তরে ভাগ করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। বর্তমানে এসব পদে ভাইভায় ১০ নম্বর থাকলেও নতুন প্রস্তাবে গ্রেডভেদে তা ২৫, ৪০ ও ৫০ নম্বর করার কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে ১১ ও ১২ গ্রেডের পদে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর বাড়ছে ৪০০ শতাংশ। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৯০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ৫০ শতাংশ নম্বর প্রয়োজন হলেও নতুন বিধিমালায় তা কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
১৩ থেকে ১৬ গ্রেডের পদে বর্তমানে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় যথাক্রমে ৯০ ও ১০ নম্বর রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে লিখিত পরীক্ষায় ৬০ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৪০ নম্বর রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে ১৭ থেকে ২০ গ্রেডের পদে বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় ৪০ এবং ভাইভায় ১০ নম্বর রয়েছে। প্রস্তাবিত বিধিমালায় লিখিত ও মৌখিক—দুই পরীক্ষায় ২৫ নম্বর করে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালায় কারিগরি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও পৃথক বিধান রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাকে ব্যবহারিক পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হবে। লিখিত ও ব্যবহারিক—দুই পরীক্ষায় পাস করার পরই তিনি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে তাকে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হবে না।
বর্তমানে ১ থেকে ১০ গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয় সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে। আর ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের নিয়োগ হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী। পিএসসির নিয়োগপ্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচিত হলেও মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরগুলোর নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিভিল প্রশাসনে সরকারি পদের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। এর মধ্যে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীর পদ প্রায় ১৩ লাখ ২৫ হাজার। অর্থাৎ প্রস্তাবিত বিধিমালা কার্যকর হলে সিভিল প্রশাসনের প্রায় ৬৫ শতাংশ নিয়োগ এ পরিবর্তনের আওতায় আসবে।
তবে প্রস্তাবিত বিধিমালা শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়োগে প্রযোজ্য হবে না। পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, আনসার ব্যাটালিয়ন, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, র্যাবসহ অন্যান্য বাহিনী এবং সরকারি কর্ম কমিশনের আওতাভুক্ত পদগুলোও এ বিধিমালার বাইরে থাকবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলছে, এসব পদে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য প্রার্থীর নিয়োগ পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের লক্ষ্যে বিদ্যমান পরীক্ষার নম্বর বণ্টনে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।
এদিকে ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মৌখিক পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে বিষয়ভিত্তিক ও পরীক্ষকের মূল্যায়ননির্ভর হওয়ায় সেখানে পছন্দের প্রার্থীকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরগুলোর নিয়োগে আগে থেকেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ থাকায় ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে এসব ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তারা বলছেন , এমন সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তিতে এখন যেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তেমনি ভবিষ্যতেও এর প্রভাব থাকতে পারে। সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়। এ সিদ্ধান্ত সুশাসনের পরিপন্থী।
অন্যদিকে, আজ বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকারি চাকরির নতুন খসড়া বিধিমালায় ভাইভায় নতুন মার্কিং সরকারের কাছে ‘বেটার’ মনে হয়েছে বলেই এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়োগের মানোন্নয়নের বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
ভাইভায় বেশি নম্বর রাখার ফলে লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া প্রার্থীকে পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভাইভা যেহেতু সাবজেক্টিভ, তাই সেখানে কারসাজি বা পছন্দের কাউকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি—এ বিষয়ে তিনি দ্বিমত করছেন না।
তবে তিনি বলেন, চাকরির জন্য শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। একজন প্রার্থীর অন্যান্য যোগ্যতা ও অ্যাপটিটিউডও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো নিয়োগের পর সুনির্দিষ্ট অনিয়ম বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গণমাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম হলে তা অবশ্যই ঠেকানোর চেষ্টা করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন।
এ সময় লিখিত ও ভাইভায় একজন প্রার্থী কত নম্বর পেয়েছেন, তা প্রকাশের বিধান করা যায় কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে আলাপ করতে পারি।’