জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; এর প্রভাব জাতীয় সীমানা অতিক্রম করছে। তাই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সোমবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘সাউথ এশিয়া রিজিওনাল ক্লাইমেট কোঅপারেশন (এসএআরসিসি)’ সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘কো-ডিজাইন দ্য ফিউচার অব সাউথ-এশিয়ান ক্লাইমেট ডিপ্লোমেসি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সভায় জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, গবেষক, উন্নয়নকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী ও তরুণ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ও পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বর্তমানে নানা ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে, বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
তিনি বলেন, নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে আন্তঃসীমান্ত পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তবে শুধু আলোচনা বা প্রকল্প গ্রহণ করলেই নদী রক্ষা করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দূষণের উৎস বন্ধ করা না গেলে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীকে রক্ষা করা কঠিন হবে। নদীতে পতিত দূষণমুখগুলো বন্ধ করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সার্ক ও বিমসটেককে আরও সক্রিয় করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; এটি আন্তঃদেশীয় সমস্যা। আর এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর ও ঝুঁকিমুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। কোনো দেশের সঙ্গে শত্রুতা নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথ বের করতে হবে।
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের কো-অর্ডিনেটর শরীফ জামিল দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু, পানি ও নদীসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে আঞ্চলিক পর্যায়ে সরকারের আরও সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার সংকট সমাধানে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আলোচনা বাড়াতে হবে।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, ট্রান্সবাউন্ডারি বা আন্তঃসীমান্ত বায়ুদূষণ বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রিন কানেক্টিভিটি, জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে যৌথ দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো হুমকি নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান উন্নয়ন বাস্তবতার অংশ। তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, হিমবাহের পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব জাতীয় সীমানা অতিক্রম করছে।
তিনি আরও বলেন, এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত, আঞ্চলিক ও ভবিষ্যতমুখী উদ্যোগ অপরিহার্য। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি জলবায়ু কূটনীতিকে কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হাবিব রহমান। বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় অংশ নেন হিউম্যান সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এম এ মুকিত এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী।
এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন সিসিডিবির জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির সমন্বয়কারী মো. আশরাফুজ্জামান খান, আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম দিপু, হেলভেটাস বাংলাদেশের ওয়াটার, ফুড অ্যান্ড ক্লাইমেট কর্মসূচির প্রধান মাহমুদুল হাসান তারেক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের সহকারী পরিচালক শারমিন নাহার নিপা এবং সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক পলিউশন স্টাডিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান মজুমদার।
আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আলী শাহীন, পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. হাসিব মো. ইরফানউল্লাহ এবং উন্নয়ন অন্বেষণের পরিচালক এস এম মনজুর রশিদ।
সভায় বক্তারা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জলবায়ু কূটনীতি জোরদার, অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তি বিনিময়সহ জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।