হোম > জাতীয়

নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ছে ধর্ষণ ও হত্যা, উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা

জাতীয় কন্যাশিশু দিবস আজ

এমরানা আহমেদ

ছবি: সংগৃহীত

কন্যাশিশুর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার কথা উচ্চারিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। অথচ বাংলাদেশে সম্প্রতি একের পর এক কন্যাশিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা সেই নিরাপত্তাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা, চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের ফারিয়াকে ধর্ষণ, পাবনায় চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার করে লাশ টুকরো করার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ আশুগঞ্জে সাত বছরের মাহিদার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ আরো বেড়েছে।

পরিবারের অভিযোগ ও প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধী হিসেবে উঠে আসছে প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা পরিচিতজনের নাম। এতে করে ঘরের কাছেই শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত অভিভাবকরা।

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের প্রাক্কালে প্রকাশিত বিভিন্ন সংস্থার তথ্যও পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরো ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। এছাড়া ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। আসকের হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জুলাই ও আগস্ট মাসের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধির তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, আগস্টে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে মোট ৩২৭টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে জুলাইয়ে ছিল ৩০৬টি। অর্থাৎ এক মাসে প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি। আরো উদ্বেগের বিষয়, নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা জুলাইয়ের ৫২টি থেকে আগস্টে বেড়ে ৯১টিতে দাঁড়িয়েছে—প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ৭ থেকে বেড়ে ১২টি এবং ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ৩ থেকে বেড়ে ৫টিতে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের পরিসংখ্যানেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৪০৯ নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে কন্যাশিশু ১৩১ জন। এ সময়ে রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে আরো ১৩৯ জনের, যার মধ্যে ১১০ জন কন্যাশিশু। আত্মহত্যা করেছে ৩০৩ জন নারী ও কন্যাশিশু; তাদের মধ্যে কন্যাশিশু ৯৫ জন। একই সময়ে ৬৪৬ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে কন্যাশিশু ৩৯৮ জন। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরো ১১০ কন্যাশিশু। ৭০টি জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্র এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ফোরাম।

শুধু প্রকাশ্যে আসা ঘটনাই নয়, শিশুদের কাছ থেকে সহায়তার আবেদনও বাড়ছে। বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্পলাইনের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শিশু যৌন হয়রানি-সংক্রান্ত ৫ হাজার ৮৫৩টি কল এসেছে। এর মধ্যে ৫২০টি কল ছিল শিশু ধর্ষণের ঘটনায়। চাইল্ড হেল্পলাইনের ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহায়মেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রতিবছর এ ধরনের কলের সংখ্যা বাড়ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যেও ধর্ষণ মামলার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় ধর্ষণের অভিযোগে ৪৬৫৪টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৩২৫২টি। এর মধ্যে মার্চ-জুন সময়ে হয়েছে ১৯৪০টি। জুলাইয়ে ৭০৭ এবং আগস্টে ৬৯৫টি ধর্ষণ মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। গত বছরের মার্চ-জুনে ১৫২৮টি মামলা হয়েছিল। অর্থাৎ একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরে মামলা বেড়েছে ৪১২টি। এ সময় সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ মামলা হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায়।

কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার কারণ হিসেবে মানবাধিকারকর্মীরা একাধিক বিষয়কে দায়ী করছেন। তাদের মতে, মাদকাসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অনলাইন পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, পারিবারিক ও শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি, সামাজিক বৈষম্য এবং অপরাধের পর দায়মুক্তির প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহার মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, পারিবারিক সহিংসতা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, অনলাইন পর্নোগ্রাফি ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ার অন্যতম কারণ। আমরা এ পরিস্থিতির অবসান চাই। সহিংসতায় ভুক্তভোগী নারী ও কন্যার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানে রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ করি।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান এ্যানীর মতে, এ সংকটের পেছনে একক কোনো কারণ নেই।

সামাজিক ও পারিবারিক দুর্বলতার পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহার, কিশোর গ্যাং, মাদক, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি শিশুদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তার মতে, শুধু নতুন আইন করলেই হবে না; বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচার এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।

দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য—‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্ব জয়’। ২০০০ সাল থেকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূর করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠাই এ দিবসের অন্যতম লক্ষ্য।

বাংলাদেশের সংবিধান, জাতীয় শিশু নীতি-২০১১ এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও বিকাশের অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু শুধু অধিকার স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দ্রুত বিচার, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভুক্তভোগী শিশু ও পরিবারের জন্য আইনি, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ সংঘটনের পর শাস্তির পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায়ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি দিবসের কর্মসূচি নয়। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব। শিশুর ঘর, স্কুল, পাড়া কিংবা অনলাইন—কোনো জায়গাই যেন তার জন্য অনিরাপদ না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সার ডিলার নিয়োগে সচিবালয়ে এমপি-নেতাদের দৌড়ঝাঁপ

চার জেলায় নতুন ডিসি

ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের আলোচনা সভা-র‌্যালি

থার্ড টার্মিনালের ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: তারিক সিদ্দিককে দুদকে তলব

নিঃশ্বাসের ধূসরতা থেকে পরিষ্কার বায়ুর পথে যুবদের ১৫ দফা দাবি

১৪৮ সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিক্ষার্থী পেল শিক্ষা উপকরণ

সেই মেহেদী হাসানের চাকরি গেল, বরখাস্ত এডিসি রহমত উল্লাহও

পারস্পরিক আইনি সহায়তা জোরদারে গুরুত্বারোপ আইনমন্ত্রীর

উন্নয়ন প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয় কমানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

শিক্ষানীতি ও নতুন পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে মাহ্দী আমিন