কোনো ধরনের আলোচনা, গণশুনানি, জনপরামর্শ ও অংশীজনের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা কিংবা মূল্যবৃদ্ধির সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রকাশ্য মূল্যায়ন ছাড়াই আকস্মিকভাবে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করবার সরকারের এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা ও রাজস্ব চাপের অজুহাতে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত জনস্বার্থবিরোধী, অপরিণামদর্শী ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্তরায়।
মঙ্গলবার আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের পাঠানো এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়।
আন্তর্জাতিক বাজার ও রাষ্ট্রীয় আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা এবং উৎপাদনশীল খাতের সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া; দেশের অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সুরক্ষায় আইপিডি সরকারের কাছে ৭ দফা দাবি জানিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে- অবিলম্বে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য বাতিল করতে হবে; ভবিষ্যতে জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন এর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হব; আন্তর্জাতিক বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির ওপর প্রযোজ্য শুল্ক, কর ও ভ্যাট সাময়িকভাবে সমন্বয় করে ভোক্তার ওপর চাপ কমাতে হবে; সবার জন্য ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে কৃষি সেচ, গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন ও জরুরি সেবায় ডিজিটালভাবে যাচাইযোগ্য লক্ষ্যভিত্তিক জ্বালানি সহায়তা চালু করতে হবে; ডিজেল-নির্ভর কৃষি কমাতে সৌর সেচ দ্রুত সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের সহজ অর্থায়ন ও প্রণোদনা দিতে হবে; জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অপচয়, অদক্ষতা, সিস্টেম লস ও উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ এর কাঠামো স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে; কৌশলগত জ্বালানি মজুত, গণপরিবহন, রেল ও নৌপথ, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
আইপিডি মনে করে-বৈশ্বিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট বা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার কারণে তেলের দাম সরাসরি ভোক্তাপর্যায়ে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া কোনো টেকসই বা পরিকল্পিত সমাধান নয়। আমাদের অর্থনীতিতে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ডিজেল, যা দেশের পরিবহন, কৃষি ও পণ্য সরবরাহের মূল চালিকাশক্তি। ফলে জ্বালানির এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি বাস ও পণ্য পরিবহন ভাড়া অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেবে, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রাকে চরম সংকটে ফেলবে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ চলমান আছে। সে তুলনায় দেশের বিশাল সংখ্যক বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে না। পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থাও এই মূহুর্তে স্থিতিশীল নয়। এই বছরের এপ্রিল মাসে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ১৫-২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। ফলে বিগত পাঁচ মাসের মধ্যেই তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বিশাল সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। একইসাথে নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপন ও বেঁচে থাকার সংগ্রামকে সামনের দিনে আরও কঠিন করে তুলবে।
আইপিডি মনে করে, জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ শুধু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এর আয়-ব্যয়ের বিষয় নয়। এর সঙ্গে গণপরিবহন, কৃষি, শিল্প, পণ্য সরবরাহ, খাদ্য মূল্য, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সরাসরি যুক্ত। ফলে এ ধরনের বড় মূল্যবৃদ্ধির আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজন, কৃষক, পরিবহন খাত, শিল্পোদ্যোক্তা, ভোক্তা প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা এবং সম্ভাব্য অভিঘাত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ে চাপ তৈরি করবে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
আইপিডি মনে করে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং বিপিসির আর্থিক চাপ বাস্তব হলেও এর পুরো বোঝা একবারে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়। বিপিসির আর্থিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি জনগণ ও উৎপাদনশীল খাতকে সুরক্ষায় বিকল্প নীতিও বিবেচনা করবার প্রয়োজন ছিল। বৈশ্বিক সংকটে শুধু মূল্যবৃদ্ধিই যে একমাত্র পথ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের সে শিক্ষাই দেয়। সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটে মূল্যবৃদ্ধির বাইরে জ্বালানি সাশ্রয়, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, রেশনিং ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের নীতি নিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।
শ্রীলঙ্কা জ্বালানি সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় 'কিউআর-কোডভিত্তিক' ফুয়েল কোটা চালু করেছে। যানবাহনের ধরন অনুযায়ী সাপ্তাহিক জ্বালানি সীমা নির্ধারণ করেছে এবং কৃষি ও অন্যান্য জরুরি খাতের জন্য বিশেষ সরবরাহ ব্যবস্থা রেখেছে। থাইল্যান্ড তাদের জাতীয় 'অয়েল ফান্ড' ব্যবহার করে ডিজেলের ওপর বড় অঙ্কের ভর্তুকি বজায় রেখেছে নিবন্ধিত পণ্য পরিবহনকারী ট্রাক, পাবলিক বাস ও গণ-পরিবহন এর ক্ষেত্রে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন ব্যয় বাড়েনি, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে বাড়তে দেয়নি।
ভারত কৃষিতে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে পিএম-কুসুম প্রকল্পের মাধ্যমে সৌর কৃষি পাম্প কর্মসূচি সম্প্রসারণ করছে। মরক্কো গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা হিসেবে ভর্তুকি দিয়েছে।
এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান শুধু ভোক্তার কাছে দাম বাড়ানো নয়; একই সঙ্গে চাহিদা ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, জ্বালানি দক্ষতা এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর এর মাধ্যমে আপদকালীন সময়ে জ্বালানি সংকট মোকাবেলা সম্ভব।
একইসাথে জার্মানি, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়ার মত অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশও বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও করছাড়ের মাধ্যমেও এই সংকট মোকাবেলা করবার চেষ্টা করছে। ফ্রান্স জ্বালানি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত ও জ্বালানি-নির্ভর কৃষিসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে 'সুনির্দিষ্ট ফুয়েল সহায়তা' অব্যাহত রেখেছে। ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশেও শুল্ক ও করছাড়ের মত নীতি সহায়তা দেবার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবার কোন বিকল্প নেই বলে মনে করে আইপিডি।
আইপিডি মনে করে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময়ে শুধু মূল্য বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় আর্থিক চাপ সামাল দেওয়ার পরিবর্তে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন, গণ-পরিবহন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য রেখে জ্বালানি মূলনীতি প্রণয়ন করা জরুরি। উৎপাদনশীল খাতকে সুরক্ষা, জনস্বার্থ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি পুনর্বিবেচনা করে অবিলম্বে প্রত্যাহার করবার জোর দাবী জানাচ্ছে আইপিডি।