বাইশ বছর আগে ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সন্ত্রাস ও সহিংসতাবিরোধী সমাবেশটি ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার শিকার হয়। ওই দিন বিকাল সাড়ে ৫টায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বক্তব্য শেষ করে ট্রাকমঞ্চ থেকে নামার মুহূর্তেই এ হামলার ঘটনা ঘটে।
ওই সমাবেশে পরপর ১৩-১৪টি বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করা হয়।
মামলা করার পর থেকেই তদন্ত নিয়ে নানামুখী বিতর্ক দেখা দেয়। দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ায় বারবার মামলার নথি হাতবদল হয় এবং একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। প্রথমে মতিঝিল থানা পুলিশ ও পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ঘটনার তদন্ত শুরু করলেও দ্রুত তা সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।
সিআইডির অধীনেই এএসপি রোকনুজ্জামান, এএসপি আবদুর রশীদ, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান এবং এএসপি ফজলুল কবীর একের পর এক তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০০৯ সালে সরকার পরিবর্তনের পর অবসরপ্রাপ্ত সিআইডি কর্মকর্তা আবদুল কাহার আকন্দকে নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ২০১১ সালে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন। ঘনঘন তদন্ত কর্মকর্তা বদলি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার এই রদবদল শুরু থেকেই মামলার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দেয়। বিচারিক আদালত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। একই সঙ্গে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে শুরু থেকেই বিএনপির পক্ষ থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ও অসৎ অভিপ্রায়ে দলটির নেতাদের এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ করা হয়।
২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিভাগ বিচারিক আদালতের রায় বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ দণ্ডিত ৩৮ আসামির সবাইকে মামলা থেকে পূর্ণাঙ্গ খালাস দেয়।
হাইকোর্টের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল আবেদন করলে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে হাইকোর্টের খালাসের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। আপিল বিভাগের এই সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানসহ সব আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়।
উচ্চ আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দেওয়ার পেছনে বেশ কিছু গুরুতর প্রক্রিয়াগত ও আইনি ত্রুটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। প্রথমত, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী যেকোনো প্রথম বা সম্পূরক চার্জশিট প্রথমে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিল করা আইনত বাধ্যতামূলক হলেও এই মামলার দ্বিতীয় সম্পূরক চার্জশিটটি সরাসরি দায়রা আদালতে জমা দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে হাইকোর্ট পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকেই আইনগতভাবে অবৈধ সাব্যস্ত করেন। দ্বিতীয়ত, নিম্ন আদালতের দেওয়া দণ্ডাদেশের প্রধান ভিত্তি ছিল আসামি মুফতি আবদুল হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি। তবে আদালত পর্যবেক্ষণ করে, বলপ্রয়োগ ও নির্যাতনের মাধ্যমে এই জবানবন্দি আদায় করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে তিনি তা প্রত্যাহারও করেন, যা সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ মূল্যহীন ও অগ্রহণযোগ্য। এছাড়া প্রসিকিউশন পক্ষ আসামিদের ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত করার মতো কোনো শক্তিশালী সাক্ষ্যপ্রমাণ দাখিল করতে পারেনি; বরং বিচার প্রক্রিয়াটি মূলত পরোক্ষ বা ‘শোনা কথা’র ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়েছিল। তদন্তের অস্বচ্ছতা ও এসব মৌলিক আইনি ত্রুটির কারণেই উচ্চ আদালত রায় বাতিল করে সব আসামিকে খালাসের সিদ্ধান্ত দেয়।