ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বর্ষণের কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ দেশের বেশকিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এরই মধ্যে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার বিপৎসীমা অতিক্রম করায় পানি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি তথা সব গেট খুলে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
এছাড়া কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মতো নদী-তীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলগুলোতে পানি বিপৎসীমা ছুঁইছুঁই করছে। পানির চাপ নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ায় লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার চরাঞ্চলে পরিস্থিতি বেশ নাজুক। ক্রমেই প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল।
গতকাল মঙ্গলবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়, দেশের সব প্রধান নদ-নদীসমূহ বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তা নদী ডালিয়া (নীলফামারী) ও কাউনিয়া (রংপুর) স্টেশনে, সুরমা নদী ছাতক (সুনামগঞ্জ) স্টেশনে, কুশিয়ারা নদী ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) ও মারকুলি (সুনামগঞ্জ) স্টেশনে এবং সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) স্টেশনে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া আমার দেশকে বলেন, ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বেড়ে উত্তরের চার জেলায় সাময়িকভাবে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ভারী বৃষ্টি এবং ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ায় তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। গতকাল বেলা তিনটায় তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি পরিস্থিতি সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট সার্বক্ষণিক খুলে দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
স্থানীয় পাউবো সূত্র জানিয়েছে, আগামী দুই-তিনদিন এই অঞ্চলে ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকতে পারে। এতে লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ত্রাণ নয়, পানি বন্ধ চাই
তিস্তার বাঁধে কথা হয় সাবেক স্কুলশিক্ষক মহিরুদ্দিনের সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভারত তাদের গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দিয়ে আমাদের পানিতে ভাসাচ্ছে। আমি ভারতের এই অমানবিক আচরণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে ত্রাণ নয়, আমরা চাই ভারতের পানি আসা বন্ধের ব্যবস্থা করা হোক।
তিস্তাতীরের উত্তর গড্ডিমারী গ্রামের মোন্তাজ মিয়া বলেন, তিস্তা-তীরবর্তী এলাকার রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। এভাবে পানি আসতে থাকলে যেকোনো সময় আরো ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, বৃষ্টিতে ভারত থেকে নেমে আসা উজানের ঢলে তিস্তাপাড়ের নিম্নাঞ্চলে দেখা দিয়েছে বন্যা। এসব অঞ্চলের জনগণকে সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে। আমরা সার্বক্ষণিক পানি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।
তিস্তা ব্যারাজের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, মঙ্গলবার বেলা ৩টায় তিস্তার পানি আরো বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খোলা রাখা হয়েছে । আমরা সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ও রাস্তাগুলো পর্যবেক্ষণ করছি।
ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে তিস্তা নদীর পানি নীলফামারীর ডিমলা ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চলের প্রায় হাজারো ঘরবাড়ি এবং পানিবন্দি হয়েছে পড়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পরিবার।
ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) হাফিজুর রহমান জানান, সোমবার রাত থেকে তিস্তার পানি বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা দিশাহারা হয়ে উঁচু জায়গায় যেতে বাধ্য হন। এতে চর, গ্রামসহ নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করে প্রায় এক হাজার পরিবার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দ্রুত তাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন লালমনিরহাট ও নীলফামারী প্রতিনিধি]