বাড়ছে ক্রেতার ভিড়
ঈদুল আজহার মাত্র দুদিন আগে রাজধানীর পশুর হাটে মেঘ, থেমে থেমে বৃষ্টি আর হাঁটুসমান কাদা—এমন অস্বস্তিকর বাস্তবতার মধ্যে গতকাল সোমবার থেকে জমতে শুরু করেছে বেচাকেনা। রাজধানীর বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, হাটে পশুর সরবরাহে ঘাটতি নেই, কিন্তু ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে দামের ব্যবধান যেন কিছুতেই কমছে না।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কাদা-পানির দুর্ভোগ, অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ, যানজট আর অব্যবস্থাপনা। ফলে কোরবানির উৎসবের আবহের পাশাপাশি বাড়ছে অস্বস্তিও।
রাজধানীতে এবার মোট ২৭-২৮টি পশুর হাট বসেছে, যার মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে ১৫-১৬টি এবং দক্ষিণ সিটির অধীনে ১২টি। দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের দিনসহ মোট পাঁচ দিন এসব হাটে আনুষ্ঠানিকভাবে কেনাবেচা চলবে। তবে আনুষ্ঠানিক হাটের বাইরেও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন মাঠে পশু বিক্রি চলছে।
ঈদ সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার গরু রাজধানীতে ঢুকছে। বড় ট্রাক, মিনি ট্রাক, পিকআপ—সব মিলিয়ে রাজধানীর প্রবেশপথগুলো কার্যত পশুবাহী যানবাহনের দখলে। রাজধানীর সবচেয়ে বড় হাট গাবতলীর হাটে সোমবার সকাল থেকেই শত শত ট্রাক গরু নিয়ে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কুষ্টিয়া, পাবনা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল ও ঝিনাইদহ থেকে আসা খামারিরা বড় আশা নিয়ে ঢাকায় এলেও বৃষ্টির কারণে অনেকেই বৃষ্টিতে ছন্নছাড়া রাজধানীর পশুর হাট, ক্রেতার অপেক্ষায় ব্যাপারীরা বিপাকে পড়েছেন।
কাদা আর যানজটে স্তব্ধ
গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীতে বৃষ্টি নামলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়ে। গাবতলী, শাহজাহানপুর, কমলাপুর, দিয়াবাড়ীসহ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার পশু কেনাবেচার মাঠে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় মুহূর্তের মধ্যে কাদার আস্তরণ পড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যাপারীরা গরু নিয়ে আটকে পড়েন কাদায়—কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও গোড়ালি সমান। এতে ক্রেতারা পশুর কাছে যেতে সাহস পাচ্ছেন না, দূর থেকে দাম জিজ্ঞেস করেই সরে যাচ্ছেন। গাবতলী হাটের ভেতরে হাঁটলেই চোখে পড়ে কাদা আর পানির মিশ্র এক দুর্ভোগ। কোথাও গরু কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও আবার বিক্রেতারা বাঁশ ও খড় বিছিয়ে অস্থায়ী শুকনা জায়গা তৈরির চেষ্টা করছেন। কয়েকজন ব্যাপারী অভিযোগ করেন, হাট ইজারাদাররা কোটি কোটি টাকায় ইজারা নিলেও বৃষ্টির পানি সরানোর কার্যকর ব্যবস্থা রাখেননি। ফলে ক্রেতারাও ভেতরে ঢুকতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
অবশ্য মিরপুরের কালশী হাটে পুরো মাঠে ছাউনির ব্যবস্থা থাকায় কাদা-পানির দুর্ভোগ কিছুটা কম রয়েছে। একজন ক্রেতা বলেন, অনেক হাটে কাদার কারণে দাঁড়ানো যায় না; কিন্তু এখানকার পরিবেশ তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো হওয়ায় সময় নিয়ে গরু দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে দিয়াবাড়ী হাটে পশুর সারি মূল সীমানা ছাড়িয়ে প্রধান সড়কে চলে আসায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। পরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং ইজারাদারকে কঠোরভাবে সতর্ক করেন। কেরানীগঞ্জ হাট ঘিরেও একই ধরনের যানজটের অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
হিসাব মিলছে না দামে
হাটে ক্রেতাদের আনাগোনা থাকলেও বেচাকেনা পুরোদমে জমেনি। দাম শুনেই অনেকের চোখ কপালে উঠছে। গাবতলী হাটে আসা মিরপুরের বাসিন্দা আজাদ হোসেন জানান, সকাল থেকে দুই ঘণ্টা ধরে মাঝারি গরু খুঁজছেন। তার সর্বোচ্চ বাজেট এক লাখ ৬০ হাজার টাকা, অথচ তার পছন্দের গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে আড়াই লাখ টাকা। ফলে একা কোরবানি না দিয়ে ভাগে দেওয়ার কথা ভাবছেন তিনি। কালশী হাটে আসা জুবায়ের ও তার পরিবারের বাজেট দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা; কিন্তু পছন্দের গরুগুলোর দাম সাড়ে তিন থেকে চার লাখ চাওয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত গাবতলীর দিকে রওনা হন তারা।
বিক্রেতারা অবশ্য দাবি করছেন, গোখাদ্যের দাম এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ও শ্রম খরচের বোঝা। ফলে ক্রেতার চাওয়া দামে গরু বিক্রি করতে গেলে প্রতিটিতে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়। রাজবাড়ীর কালুখালী থেকে আসা সাইফুল শেখ বলেন, ক্রেতারা গরুপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা কম বলছেন, সেই দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়।
হাসিলের বাইরেও টাকার ফন্দি
দুই সিটি করপোরেশনের নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, নির্ধারিত হাসিল ছাড়া অন্য কোনোভাবে অর্থ আদায়ের সুযোগ ইজারাদারের নেই। কর্মকর্তারা বলছেন, কেউ অভিযোগ করলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা আলাদা।
গাবতলী ও কেরানীগঞ্জের হাটে গরু রাখার জায়গা বা ‘খুঁটি বাবদ’ তিন থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একাধিক ব্যাপারীর কাছ থেকে। আমার দেশ সরেজমিন ঘুরে এর সত্যতা পেয়েছে। পিকআপ আনলোডিং ও নিরাপত্তার নামেও আলাদা অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে। হাট কর্তৃপক্ষ মাইকিং করে সতর্ক করলেও গোপনে আদায়ের অপতৎপরতা থেমে নেই বলে জানান একাধিক ব্যাপারী।
চাঁদাবাজি : প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, কোরবানির পশুর হাট ঘিরে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি সহ্য করা হবে না। পশু আনা-নেওয়ার সময় সড়কে চাঁদাবাজি রোধে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তবে রাজশাহী, পাবনা ও জামালপুর থেকে আসা কয়েকজন ব্যাপারী জানান, গরুপ্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়েছে। যদিও এবার অনেক ব্যাপারী একজোট হয়ে প্রতিবাদের ঘোষণা দিয়েছেন।
বড় গরু দেখতে ভিড়, কিনতে নারাজ
হাটে পর্যাপ্ত পশু থাকলেও সে তুলনায় ক্রেতা কম। বড় গরুর সামনে ভিড় জমলেও কেনার ব্যাপারে পিছিয়ে যাচ্ছেন অধিকাংশ। কালশী হাটে সাত বছর ধরে লালন করা ২৬-২৭ মণ মাংসের একটি গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে আট লাখ টাকা; কিন্তু সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত উঠছে দর। দিয়াবাড়ী হাটে চুয়াডাঙ্গা থেকে আনা বিশালাকার গরুর দাম ২০ লাখ টাকার বেশি হাঁকা হলেও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা মিলছে না।
কোরবানির সংখ্যা কমার শঙ্কা
প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কমে যাওয়ার কারণে এবার এককভাবে কোরবানির সংখ্যা আরো কমতে পারে। ২০২৪ সালে দেশে পশু কোরবানি হয়েছিল এক কোটি চার লাখ। পরের বছর ২০২৫ সালে তা ১৩ লাখ কমে ৯১ লাখে নেমে আসে। এবার সেই ধারা আরো নামতে পারে বলে মাঠপর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
শেষ দুদিনে ভরসা
হাট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও যানজট নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত আলো, পানির ব্যবস্থা এবং পশুর চিকিৎসার জন্য ভেটেরিনারি টিম রাখা হয়েছে হাটে। যদিও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা খুবই অপ্রতুল। সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অস্থায়ী চিকিৎসক টিম ও বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। যদিও তা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। বিক্রেতারা আশায় আছেন আজ মঙ্গলবার থেকে শেষ সময়ে ক্রেতার ঢল নামবে। আর ক্রেতারা ভাবছেন, শেষ মুহূর্তে চাপ বাড়লে বিক্রেতারা হয়তো দামে একটু নমনীয় হবেন। দুপক্ষের এই পারস্পরিক প্রত্যাশার মাঝে রাজধানীর পশুর হাটের বাকি দুটি দিন কোন দিকে যাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।