সমুদ্র এলাকার পর এবার দেশের স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে এ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ তথ্য জানিয়েছেন জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব উৎপাদন বাড়ানোর নীতির অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান সরকারের নীতিনির্ধারকরা।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দুই দশক ধরে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে সমীক্ষা ও অনুসন্ধানে জোরালো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) শক্তি ও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়া হয়নি ওই সময়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে সারা দেশে ১০০ কূপ খননের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা আলোর মুখ দেখেনি। ওই সময় বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি না হওয়ায় ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে জ্বালানি খাত।
গ্যাসের অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নীরবতাকে ‘রহস্যজনক’ উল্লেখ করে এ খাতের বিশেষজ্ঞরা জানান, গ্যাস অনুসন্ধান ও নতুন সমীক্ষা না চালিয়ে দেশবাসীকে জিম্মি করে আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি খাতে লুণ্ঠন কার্যক্রম চালিয়েছে। গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রেখে ঘাটতি মেটাতে মাত্র আট বছরে দুই লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হয়েছে। ফলে আমদানি দায় মেটাতে গিয়ে জাতীয় বাজেটে টান পড়েছে।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা দিনে ৩৮০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে ২৬৫ কোটি ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে প্রতিদিন ১১৫ কোটি ঘনফুট ঘাটতি থাকছে। এতে বাসাবাড়ি, শিল্প ও কলকারখানা এবং পরিবহনে গ্যাস সংকট লেগেই আছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বাপেক্সের মাধ্যমে অনুসন্ধান ও খনন কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুটি নতুন রিগ কেনারও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা জানান, বঙ্গোপসাগরের অফশোর ও অনশোরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আহ্বান জানিয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো থেকে এ বিষয়ে ব্যাপক সাড়া পাবে বাংলাদেশ-এমনটি প্রত্যাশা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট আছে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। দৈনিক এক হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ করা হলে অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুতের ভিত্তিতে আনুমানিক ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে। নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এক যুগ পর বাংলাদেশ প্রাকৃতিক গ্যাসশূন্য হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।
কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ১০০ বছরের ইতিহাসে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে মাত্র ১০১টি। বর্তমানে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে আর চারটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ২০টি ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে।
আমদানির লাগাম টানতে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আমার দেশকে বলেন, আমরা ইতোমধ্যে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছি। সেখানে ভালো ফল আসবে বলে আশা করছি।
তিনি বলেন, ১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকার দেশের ইতিহাসে প্রথম এ খাতে বিডিং রাউন্ডের সফল সূচনা করে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে এগিয়ে আসে। বর্তমান সরকারও সে ধারায় ফিরছে। তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমকে আরো জোরালো করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে দেশের জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছে। আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাই বলেই তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছি। বর্তমান সরকারের চাওয়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ কারণেই আমরা বঙ্গোপসাগরের পর এখন দেশের স্থলভাগেও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের দিকে যাচ্ছি। তিনি বলেন, আমাদের এ বিডিং রাউন্ড সফল করার জন্য অতীত থেকে অভিজ্ঞতা নেওয়ারও চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন সময় নেওয়া অনেকগুলো বিডিং রাউন্ড সফল হয়নি। আমরা সেগুলোও পর্যালোচনা করেছি।
বাংলদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানিকে (বাপেক্স) শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রের গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রেও আমাদের রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অগভীর সমুদ্রে অংশীদারত্ব চুক্তির ক্ষেত্রে বাপেক্সের জন্য ১০ শতাংশ নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থলভাগে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।