অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর মধ্যে আজ বুধবার চারটি কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন সকালে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তার কার্যালয়ে রিপোর্ট জমা দেবে বলে জানা গেছে। পরে একই দিন বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
এদিকে পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন আজ দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে এ কমিশনের মেয়াদ আরেক দফা বাড়িয়ে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছে। এর আগে বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের মেয়াদও ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
জানা গেছে, কমিশনগুলো তাদের প্রতিবেদনে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার পথ আটকানো, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদসহ ক্ষমতার ভারসাম্য, সংস্থাগুলোকে শক্তিশালীকরণ ও জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর জোর দিয়েছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র ঠেকানোর বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছে।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এ সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩ অক্টোবর নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, বিচারবিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন হয়।
এর তিনদিনের মাথায় ৬ অক্টোবর গঠন হয়েছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন। এই ছয় কমিশনকে প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ৯০ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ১৮ নভেম্বর আরও ৫টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এগুলো হলো- স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, শ্রম সংস্কার কমিশন, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সংস্কার কমিশনগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্রে বেশকিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করবে। এ লক্ষ্যে তাদের প্রতিবেদনে দুই ধরনের সুপারিশ দেবে। তাদের কিছু প্রস্তাবনা হবে স্বল্প মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য, আর কিছু দীর্ঘমেয়াদি।
সংস্কার কমিশনের বেশকিছু প্রস্তাব বিশেষ করে সংবিধান নির্বাচন কমিশন সংস্কারের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বর্তমানে সংসদ না থাকায় এ সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তী সংসদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান এককক্ষবিশিষ্ট সংসদের পরিবর্তে তারা দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদের সুপারিশ করবে। তাদের প্রস্তাবে যুক্তরাজ্য ও ভারতের আদলে শক্তিশালী নিম্নকক্ষ স্থাপনের কথা থাকবে। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে ১০০ নারী আসনসহ নিম্নকক্ষের ৪০০টি আসনের কথা বলা হয়েছে।
এক্ষেত্রে নারী আসনগুলোসহ নিম্নকক্ষের ৪০০টি আসনে নির্বাচন হবে বিদ্যমান পদ্ধতিতে। সুপারিশে উচ্চকক্ষে ১০৫ আসন থাকার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি আসনে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেবেন। সমাজের পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতির হাতে পাঁচটি আসন দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
উচ্চকক্ষের বাকি ১০০টি আসনে নির্বাচন হবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে। দলগুলো নির্বাচনে সারা দেশে যত ভোট পাবে তার অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন পাবে। দলগুলো উচ্চকক্ষে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে যাতে বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিত্ব রাখে, সেটাও উল্লেখ থাকবে।
সংবিধান সংস্কার কমিশন সূত্র জানায়, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ কয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া; প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা যাতে না হন, এমন বিধান; নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা; নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিধান; প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা; নির্বাহী বিভাগ, আইন সভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা— এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন।
এছাড়া সংবিধানের মূলনীতিতে পরিবর্তন আনার সুপারিশও করা হচ্ছে। ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’— এই তিনটিকে সংবিধানের মূলনীতি করার সুপারিশ করবে কমিশন। এই তিনটির পাশাপাশি আরও দুটি মূলনীতিও যোগ করা হতে পারে।
গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সুপারিশ প্রস্তুত করেছেন বলে জানিছেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ক্ষমতা যাতে এককেন্দ্রীকরণ না হয় আমাদের সুপারিশ থাকবে।
ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। ক্ষমতার ভাগবণ্টনের মধ্য দিয়ে ভারসাম্য তৈরি করা যাবে। দেশের জনসংখ্যার বিষয়টি বিচার করে সংসদের আকার বৃদ্ধির সুপারিশ করা হচ্ছে। নারীদের সরাসরি প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করতে হবে।
দ্বিকক্ষ সংসদ প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, নিম্নকক্ষ আরও বড় হলে আলোচনার জায়গা তৈরি হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ছোট আকারে হবে উচ্চকক্ষ। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির বিষয়ে কমিশন প্রস্তাব দেবে বলে জানান কমিশন প্রধান।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সূত্র জানায়, দীর্ঘ মেয়াদে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রস্তাব তৈরি করছে কমিশন। এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনেরও সুপারিশ করবে কমিশন।
নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ইসির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতকরণ; প্রধান নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইনে সংশোধন; গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নির্বাচন কমিশনকে দায়বদ্ধ করার জায়গা তৈরি, আরপিওতে শাস্তি ও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানগুলো কিছু ক্ষেত্রে আরও সুনির্দিষ্ট করা, হলফনামার ছকে পরিবর্তন করে প্রার্থীর বিদেশে সম্পদ থাকলে তার বিবরণ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা, হলফনামার তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করা, ‘না’ ভোটের বিধান যুক্ত করা, সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা করা, রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মনোনয়ন পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনাসহ বেশকিছু ক্ষেত্রে সুপারিশ করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, সংবিধান সংস্কারের দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থার বিষয়টি চিন্তা করে নির্বাচন সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশ সাজিয়েছে। সুপারিশে ইসির ক্ষমতা বৃদ্ধির বিপরীতে দায়বদ্ধতার মধ্যে আনার সুপারিশ করছে। এক্ষেত্রে স্পিকারের নেতৃত্বে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করবে। এক্ষেত্রে ইসির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে ওই কমিটি তদন্ত করবে।
সুপারিশের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে, বুধবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে রিপোর্ট দেবেন এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুদক সংস্কার কমিশন দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ আইনে সংশোধন আনার প্রস্তাব থাকবে। বিদ্যমান নিয়োগ পদ্ধতিতে আরও উন্নত করে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, যোগ্য ব্যক্তিদের একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগের রূপরেখা থাকবে।
বিদ্যমান নামকাওয়াস্তে স্বাধীনতার পরিবর্তে দুদককে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করা এবং মর্যাদা বাড়ানোর বিষয়ে সুপারিশ থাকবে। দুদকের উচ্চ পদে প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে অন্যান্য ক্যাডারের নিয়োগের সুপারিশ থাকবে। জনবলের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণেও কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ ও প্রক্রিয়ার কথা থাকবে।
দুদকের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি কাঠামোও প্রস্তাব করা হতে পারে। দুর্নীতির অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়ম দূর করতে এ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সুপারিশ করবে সংস্কার কমিশন।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন তাদের সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে কিছু জানাতে না চাইলেও বুধবার রিপোর্ট দেবেন এ বিষয়টি আমার দেশকে নিশ্চিত করেছেন।