রেলমন্ত্রী
আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সড়ক, রেল ও নৌপথে ঘরমুখো যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সড়ক ও সেতু, রেল এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
তিনি বলেন, ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভিন্ন আন্তঃনগর সার্ভিসে ১২৪টি মিটারগেজ ও ১৪টি ব্রডগেজ কোচ অতিরিক্ত সংযোজন করা হয়েছে। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে নিয়মিত সার্ভিসের অতিরিক্ত পাঁচজোড়া বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সড়ক ও নৌপথে সুশৃংখল ভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) ঈদযাত্রা উপলক্ষে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন (কমলাপুর) পরিদর্শন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শুরু হওয়া ঘরমুখো মানুষের যাত্রা এখন পর্যন্ত মোটামুটি স্বস্তিদায়ক বলেই জানিয়েছেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনলাইনে টিকিট বিক্রিতে যাত্রীদের ব্যাপক চাপ থাকলেও সবাই ন্যায্যভাবে টিকিট পেয়েছেন এবং রেলসহ অন্যান্য পরিবহনে যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
অনলাইনে ট্রেনের অগ্রিম টিকিটের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ৩ তারিখ থেকে ধারাবাহিকভাবে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করা হয় এবং যাত্রীরা অনলাইনে টিকিট কিনেছেন। এ সময় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচণ্ড চাপ দেখা যায়। প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ টিকিট কেনার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু রেলের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রায় ৩৬ হাজার টিকিট বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি জানান, টিকিট বুক করার পর পেমেন্টের জন্য কিছু সময় দেওয়া হয়। এ কারণে অনেক সময় টিকিট বুক হয়ে থাকায় অন্যদের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত যে যাত্রী টিকিট কিনতে চেয়েছেন, তারা সবাই ন্যায্যভাবে টিকিট পেয়েছেন।
রেলমন্ত্রী জানান, ঈদযাত্রার প্রথম দিনে ২১টি ট্রেন নির্ধারিত গন্তব্যে ছেড়ে গেছে এবং অধিকাংশই সময়মতো চলেছে। দুটি ট্রেন প্রায় ৪০ মিনিট দেরিতে ছেড়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, একটি দুর্ঘটনার কারণে ওই ট্রেনগুলো কয়েকদিন ধরে প্রায় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত দেরি করছিল। এখন তা কমিয়ে ৪০ মিনিটে আনা সম্ভব হয়েছে এবং আগামী দুই দিনের মধ্যে ট্রেন দুটি নির্ধারিত সময়েই ছাড়তে পারবে বলে আশা করা যায়।
তিনি বলেন, স্টেশনে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি সন্তুষ্টির কথা শুনেছেন। তবে যাত্রীরা এই সেবার ধারাবাহিকতা থাকবে কি না তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করে মন্ত্রী বলেন, “রেলের যে সেবার মান যাত্রীরা এখন দেখছেন, তা আমরা যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে চাই। ভবিষ্যতে এই সেবার মান আরও উন্নত হবে।”
শেখ রবিউল আলম আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী রেল যোগাযোগকে যুগোপযোগী ও জনবান্ধব করতে নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে মানুষ স্বল্প সময়ে স্বাচ্ছন্দ্যে দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াত করতে পারেন। সেই লক্ষ্যেই সরকার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে।
ঈদযাত্রার শেষ মুহূর্তে অনেক যাত্রী ছাদে উঠে যাতায়াতের চেষ্টা করেন উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এ প্রবণতা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বিপুল যাত্রীর চাপে কখনো কখনো দুই–একজন ছাদে উঠে যেতে পারেন। তিনি বলেন, “শতভাগ নিশ্চিত করা কঠিন হলেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে কেউ ছাদে উঠতে না পারে।”
ঈদযাত্রার চ্যালেঞ্জ এর বিষয়ে মন্ত্রী জানান, মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়েন, যা বিশ্বের খুব কম শহরেই দেখা যায়। এত স্বল্প সময়ে এত মানুষের যাতায়াত বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলেও সরকার তা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশে পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে নতুন কোচ, বাস ও নৌযান যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বাস ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার দিকেও সরকার কাজ করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানীর মূল্যবৃদ্ধি এবং তার প্রেক্ষিতে গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মন্ত্রী জানান।
ট্রেনের শিডিউল নিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, বড় কোনো শিডিউল বিপর্যয় এড়াতে অন্তত ৮৫ থেকে ৮৭টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ প্রয়োজন। বর্তমানে ৭৮টি লোকোমোটিভ যুক্ত করা গেছে এবং আগামী দুই দিনের মধ্যে আরও কয়েকটি যুক্ত হলে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।
নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে রেলওয়ে পুলিশ ছাড়াও নিয়মিত পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, নৌপুলিশ ও বিভিন্ন জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একযোগে কাজ করছে। পাশাপাশি আনসার সদস্যদেরও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশেষ জ্যাকেট পরিহিত স্বেচ্ছাসেবকও নিয়োগ করা হয়েছে এবং প্রায় প্রতি ৫০০ মিটার পরপর তাদের অবস্থান থাকবে।
ঢাকা–সিলেট মহাসড়কে ছয় লেনের কাজ চলমান থাকলেও অন্তত দুটি লেন দিয়ে গাড়ি চলাচল অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এতে যান চলাচল ধীরগতির হতে পারে, তবে কোথাও থেমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
ঈদযাত্রার সময় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বা সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়ার জন্য প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। আমরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখছি না। যাত্রীদের কাছে অনুরোধ থাকবে—সংকটের সময় কিছুটা ধৈর্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন।”
পরে মন্ত্রী মতিঝিল বিআরটিসি বাস ডিপো পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি ডিপো এলাকার পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন। এছাড়া আসন্ন ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে বিআরটিসির বাসসমূহ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনের নির্দেশনা প্রদান করেন।
রেলপথ মন্ত্রণালয় ও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব হাবিবুর রশিদ এমপি, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ ফাহিমুল ইসলাম, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এসময় তার সাথে ছিলেন।