সেমিনারে মাহমুদুর রহমান
বর্তমান বিশ্বে ইসরাইল, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র- এই তিন দেশে ইসলামবিদ্বেষ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা মুসলিম বিশ্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান।
সোমবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে সৈয়দ আলী খামেনী-এর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব: তত্ত্ব ও প্রয়োগ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে ঢাকায় অবস্থিত আল-মুস্তফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধির কার্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)।
মাহমুদুর রহমান বলেন, ইসরাইল বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ইসলামবিদ্বেষী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। দেশটির জনগণকে এমনভাবে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে যে তারা মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে আগ্রাসনকেই সমর্থন করছে। প্রকৃতপক্ষে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে দেশটির অধিকাংশ জনগণ মত দিচ্ছে।
তিনি ভারতকে দ্বিতীয় বৃহত্তম ইসলামবিদ্বেষী দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশটির মূলধারার গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বৃহৎ অংশ প্রকাশ্যে ইসরাইলকে সমর্থন দিচ্ছে। ভারতের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ইসরাইলের বর্বরতা, ফিলিস্তিনের গণহত্যা ও ইরানে আগ্রাসনকে সমর্থন দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরাইলি পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার সময় ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে নীরব ছিলেন। অন্যদিকে ভারত কম দামে জ্বালানি কিনতে ইরানকে ব্যবহার করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে তৃতীয় বৃহত্তম ইসলামবিদ্বেষী রাষ্ট্র উল্লেখ করে আমার দেশ সম্পাদক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ রক্ষণশীল ইভানজেলিকাল খ্রিস্টান গোষ্ঠী ইসরাইলকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়াকে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখে। এই প্রভাবের কারণে মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আর ইসরাইল-আমেরিকা মিলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি জায়োনিস্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। ইরানের পর তুরস্কতেও আগ্রাসন চালাবে।
মাহমুদুর রহমান মুসলিম দেশগুলোর অনৈক্যকে বড় দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, শিয়া-সুন্নি বিভাজন মুসলিম উম্মাহকে দুর্বল করে তুলছে। প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকার কারণেই মুসলিম বিশ্ব আজ নানা ধরনের শোষণের শিকার হচ্ছে।
তিনি ইরানের প্রশংসা করে বলেন, দেশটি শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে এবং পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। তার মতে, ইরানের এই অবস্থান থেকে মুসলিম বিশ্ব শিক্ষা নিতে পারে।
সেমিনারে বক্তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করেন। আলোচকরা বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর প্রভাবে পরিচালিত হয় এবং মুসলিম বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পশ্চিমা গণমাধ্যমে মুসলিমদের প্রতিনিয়ত নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে।
আলোচকরা মুসলিম বিশ্বের অতীত গৌরবের কথা তুলে ধরে বর্তমান দুর্বলতার কারণ বিশ্লেষণ করেন। তারা বলেন, একসময় মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতায় নেতৃত্ব দিলেও বর্তমানে ঐক্যহীনতা ও নেতৃত্ব সংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত না হয়ে ন্যায় ও সত্যের পক্ষে একত্রিত হতে হবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. জলিল রহিমি জাহানাবাদী মুসলিম উম্মাহর বর্তমান দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ঐক্যের পথে শক্ত অবস্থান তৈরি করার আহ্বান জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম. আবু সায়েম বলেন, নিপীড়িত মুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশ যখনই ক্রান্তিলগ্নে ছিল ইমাম আয়াতুল্লাহ খামেনি এদেশের পাশে ছিল। করোনাকালে ইরান বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য মেডিক্যাল সহায়তা দিয়েছিল।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ব্যাপক জ্বালানি সংকটে পড়েছে। হরমুজ প্রণালীতে বাংলাদেশি জাহাজ আটকে পড়ার ঘটনায় এ সংকট আরও তীব্রতর হয়েছে। ইমাম আয়াতুল্লাহ খামেনি বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি বাংলাদেশের সংকট সমাধানে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতেন।