প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার জন্য সরকার কাজ করছে। আশা করা যায় অতিদ্রুত দেশটিতে বাংলাদেশী কর্মী প্রেরণের পথ সুগম হবে।
সোমবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকার দলীয় সংসদ খোন্দকার আবু আশফাকের প্রশ্নের লিখিত জবাবে বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এসব কথা বলেন। মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে প্রশ্নের উত্তর দেন প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নুর।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বর্তমান অর্থবছরের ১ জুলাই, ২০২৫ হতে ৩১ মে ২০২৬ পর্যন্ত ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৫ জন কর্মীর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ কর্মী প্রেরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য বন্ধ/সংকুচিত শ্রমবাজার মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে কর্মীর পাঠানোর জন্য দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত আছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, রোমানিয়া, সিসেলস, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী প্রেরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ হতে কর্মী প্রেরণের বিষয়ে ১৮টি দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বিএনপি দলীয় এমপি খায়রুল কবির খোকনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিএমইটির সার্ভারের তথ্যানুসারে ২০০ সাল থেকে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত ১ কোটি ৪৫ লাখ ৯০ হাজার ৭২৩ কর্মীর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে।
ভুয়া চাহিদাপত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে
বিদেশে নামমাত্র কোম্পানি খুলে ভুয়া চাহিদাপত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নুরুল হক।
নোয়াখালী-৬ আসনের সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর আরও কঠোর নজরদারি ও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।
আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, বিভিন্ন দেশে কাগজে-কলমে কোম্পানি খুলে বাংলাদেশ থেকে শত শত শ্রমিক নেওয়া হচ্ছে। সেখানে গিয়ে অনেকে কাজ পাচ্ছেন না এবং মানবেতর অবস্থায় পড়ছেন। জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশিরা অথবা ওই দেশের মালিকপক্ষের সঙ্গে মিলে নামমাত্র কোম্পানি খুলে এখান থেকে লোক নিয়ে যাচ্ছে। দেখা যায় ১০ জনের কাজের জায়গায় ১০০ জন নিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, বিদেশ থেকে পাঠানো ডিমান্ড লেটার সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস সত্যায়ন করে পাঠায়। ফলে দূতাবাস পর্যায়ে আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের যেটা একটু গ্যাপ আছে, আমি মনে করি আমাদের ওখানকার যারা দূতাবাস বিশেষ করে ওই দেশগুলোতে আছেন তাদের আরেকটু কঠোর নজরদারি, মনিটরিং এবং যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ২৭টি দেশে বাংলাদেশের ৩০টি শ্রমকল্যাণ উইং রয়েছে। তবে জনবল ও আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা এই বাজেটে সরকারের কাছে বরাদ্দ চেয়েছি। আমাদের মন্ত্রণালয়ের লোকবল বাড়ানোর পাশাপাশি মাইগ্রেশন ডিপ্লোমেসিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ময়মনসিংহ-৬ আসনের সদস্য মো. কামরুল হাসানের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৮ শতাংশ সুদে জামানতবিহীন তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। আমরা এটাকে পাঁচ লাখ টাকা করার চিন্তাভাবনা করছি। তবে বিনা সুদে ঋণ চালুর কোনো সরকারি স্কিম বর্তমানে নেই বলে জানান তিনি।
রাশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে যুদ্ধে জড়ানোর অভিযোগ
এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাশিয়ায় কাজের কথা বলে কর্মী পাঠিয়ে তাদের যুদ্ধে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাশিয়াতে ৩০ জন কর্মীকে কাজের কথা বলে তাদেরকে যুদ্ধে সম্পৃক্ত করেছে। তাদের পরিবার আমাদেরকে জানিয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা ইনস্ট্যান্ট তিনটা রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বন্ধ করে দিয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়ানো অনেক বাংলাদেশি তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে সেখানে গেছেন বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
জুলাই আন্দোলনে প্রবাসীদের ভূমিকার স্বীকৃতি
গাজীপুর-৫ আসনের সদস্য ফজলুল হক মিলন জুলাই আন্দোলনের সময় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আন্দোলনের সমর্থনে ভূমিকা রাখা প্রবাসীদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়ে জানতে চান। জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনের সময় ঝুঁকি নিয়ে যারা সংহতি প্রকাশ করেছিলেন, তাদের অবদান সরকার স্মরণ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কয়েকজনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। আরও যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদেরকে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় সে বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
নারী শ্রমিকদের জন্য হটলাইন ও সেফ হোম
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য মারদিয়া মমতাজ নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি ও চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের সহায়তার জন্য ১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে। দেশের বাইরে থেকেও আমাদের যেকোনো প্রবাসী তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারবেন।
তিনি বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের দুটি সেফ হোম রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশে পর্যায়ক্রমে সেফ হোম পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নারী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে এখন আগের চেয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে তারা যেখানে যাচ্ছে সেখানে আইএলও এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে কি না, সেগুলো নিশ্চিত করার পরেই আমরা পাঠাচ্ছি।
এমএমআর