আট লাখ হেক্টর চরভূমিতে উন্নত কৃষি আবাদের মাধ্যমে চরাঞ্চলের দুই কোটি মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাচ্ছে। এক সময় যে চরে হাহাকার ছিল, সেখানেই এখন সবুজ বিপ্লবের হাতছানি দেখা দিচ্ছে। দেশের প্রায় স্থায়ী ও অস্থায়ী চরে বসবাসকারী মানুষের জীবনে লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) বাস্তবায়নাধীন ‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (১ম সংশোধিত)’ চরাঞ্চলের কৃষিতে নতুন আশার আলো জাগিয়েছে।
ডিএই-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০টি স্থায়ী ও অস্থায়ী চর রয়েছে। এসব চরের মোট আয়তন প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৪৭ হেক্টর আবাদযোগ্য এবং প্রায় এক লাখ ১,৮৯২ হেক্টর পতিত জমি। প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস এসব চরে। তাদের প্রধান জীবিকা কৃষি, মৎস্য, পশুপালন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা হলেও কৃষিই সবচেয়ে বড় অবলম্বন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশের মোট চরাঞ্চলের প্রায় ৬৭ শতাংশ উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। কুড়িগ্রাম, জামালপুর, ভোলা ও নোয়াখালী জেলার অধিকাংশ উপজেলাই চরাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। প্রতি বছর কয়েক মাস পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে চরাঞ্চলের মাটিতে নতুন পলি জমে, যা জমিকে প্রাকৃতিকভাবে উর্বর করে তোলে। ফলে তুলনামূলক কম রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হয়।
সংশ্লিষ্টরা আরো জানিয়েছেন, চরের উর্বর জমিতে বর্তমানে গম, ভুট্টা, কাউন, বাদাম, মিষ্টি আলু, তিল, তিসি, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, লাউ, করলা, চিচিঙ্গা, ঝিঙা, শিম, খিরা, বিভিন্ন শাকসবজি ছাড়াও মাসকলাই, মসুর, খেসারি ও ছোলাসহ অন্তত ২০ ধরনের ফসলের চাষ হচ্ছে। চর আলেকজান্ডার, চর ফ্যাশন, চর মনপুরা, তিস্তার চর, চর জব্বারসহ দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলে এসব ফসলের আবাদ বিস্তৃত হয়েছে।
তবে এত সম্ভাবনার পরও চরাঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন অর্জিত হচ্ছে না। কারণ, অনেক কৃষক এখনো প্রচলিত কৃষি পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। উন্নত ও উচ্চফলনশীল বীজের অভাব, বীজ সংরক্ষণে দক্ষতার ঘাটতি, সেচ সংকট, বেলে মাটির কম পানি ধারণক্ষমতা, গভীর ও অগভীর নলকূপের স্বল্পতা, কৃষিযন্ত্রের অভাব এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে আছে।
প্রকল্পের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, কৃষকের সেচ সংকট মেটাতে এলএলপি সেট ও ক্যানভাস পাইপ বিতরণের পাশাপাশি, আধুনিক উপায়ে চারা উৎপাদনের জন্য পলিসেইড হাউস ও উচ্চমূল্যের সবজি চাষের জন্য পলিনেট হাউস নির্মাণ করা হয়েছে। মাটির গুণাগুণ বাড়াতে ট্রাইকো কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্টের ব্যবহার চরের কৃষকদের মাঝে এক নতুন বিপ্লব এনেছে।
শুধু তা-ই নয়, স্যান্ডবার পদ্ধতিতে সবজি চাষ এবং পচনশীল মালচিং প্রযুক্তির ব্যবহার চরের উর্বরতাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বহুগুণ কমিয়ে এনেছে। একদিকে যেমন ৮৫২টি ফলবাগান স্থাপন করা হচ্ছে, অন্যদিকে নদীভাঙন রোধ ও পরিবেশ রক্ষায় রোপণ করা হচ্ছে তাল, নারিকেল, নিম ও জামসহ প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার গাছ।
চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) মাসুদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, চরাঞ্চলে শস্য বিন্যাস ও ফসলের আবাদী এলাকা ৫ শতাংশ বৃদ্ধির পাশাপাশি ১২টি ফসলের আধুনিক জাতের প্রদর্শনী স্থাপন করা হচ্ছে। সেচ সংকট মেটাতে কৃষক দলকে এলএলপি সেট ও ক্যানভাস পাইপ দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে ১,০০০ ফুট দূর থেকেও সেচ দেওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, চারা উৎপাদন সহজ করতে প্রকল্পভুক্ত উপজেলায় ৫ শতকের ১২১টি এবং জেলা পর্যায়ে উচ্চমূল্যের ফসলের জন্য ১০ শতকের ১৫টি পলি শেড হাউস নির্মাণ করা হয়েছে। ট্রে ও কোকো পিটের মাধ্যমে এখানে মানসম্মত চারা উৎপাদিত হচ্ছে। মাটির উর্বরতা বাড়াতে চলছে ভার্মি কম্পোস্ট ও কৃষক প্রশিক্ষণ।
অনাবাদী চরের বালু জমিতে ফসল ফলাতে ‘স্যান্ডবার টেকনোলজি’ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, জাজিরায় ২০০ বিঘা বালু জমিতে এই প্রযুক্তিতে তরমুজ চাষ হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির ফলে চরের কোনো জমি আর পতিত থাকবে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সেচ, সংরক্ষণ সুবিধা ও বাজারব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা গেলে চরাঞ্চল দেশের কৃষি উৎপাদন ও জাতীয় অর্থনীতিতে আরো বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে চরবাসীর জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হবে।
এমই