কম জমিতে চাষ, একবার গাছ লাগিয়ে বহু বছর ফল পাওয়ার সুযোগ আর জুস তৈরিতে সম্ভাবনা—এসব কারণে বাংলাদেশে প্যাশন ফলের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। আনারকলি, ট্যাং ফল বা শরবতি ফল নামেও পরিচিত এই ফল চাষ করে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের এক কৃষক প্রথম বছরেই তিন থেকে চার লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছেন বলে জানিয়েছেন। তবে ফলটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
তাদের মতে, তাজা ফল হিসেবে এর বাজার এখনো সীমিত। বরং জুস, পাল্প ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরিতে ফলটির বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশে প্যাশন ফলের চাষ নতুন নয়। প্রায় দুই দশক আগে এই ফলের চাষ ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আব্দুর রহিম।
তিনি বলেছেন, একবার গাছ লাগিয়ে যথাযথ যত্ন নিলে বছরের পর বছর ফুল ও ফল পাওয়া যায়। এ কারণে ফলটি বাংলাদেশের কৃষিতে সম্ভাবনাময় হতে পারে।
তবে বাণিজ্যিকভাবে এই ফলের চাষ কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কৃষিবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, ফলটি জুস বা শরবত তৈরির জন্য উপযোগী হলেও এর সংরক্ষণকাল কম। আবার সাধারণ ফলের মতো কামড়ে খাওয়ার সুযোগ না থাকায় ভোক্তাদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা কতটা বাড়বে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাষ
সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) তথ্য অনুযায়ী, প্যাশন ফলের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উত্তর আর্জেন্টিনার পার্বত্য অঞ্চল। পরে ফলটি আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ভারতে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়।
বাংলাদেশে মূলত পর্যটন ও পাহাড়ি অঞ্চলের মাধ্যমে ফলটির পরিচিতি ঘটে। বর্তমানে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, সিলেট ও পঞ্চগড়ের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় এর চাষ হচ্ছে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যাশন ফলের রস, বীজ ও খোসা—তিনটি অংশই শিল্পে ব্যবহার করা যায়। এ কারণে ফলটিকে ‘সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য ফল’ বলা হয়।
সংস্থাটির মতে, পুষ্টিগুণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকেও ফলটি বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সাধারণত ফুল ফোটার ৬০ থেকে ৭৫ দিন পর ফল সংগ্রহ করা যায়। খোসার রং সবুজ থেকে বেগুনি বা হলুদ হওয়া, সামান্য কুঁচকে যাওয়া এবং গন্ধ তীব্র হয়ে ওঠা ফল পাকার প্রধান লক্ষণ।
একবার গাছ লাগিয়ে বহু বছর ফল
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আব্দুর রহিম বলেন, প্রায় দুই দশক আগে তারা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ থেকে প্যাশন ফলের বিভিন্ন জাত সংগ্রহ করেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন বেশ কয়েকটা জাত আছে। তবে সবই কাছাকাছি ধরনের। এটি জুস বা শরবতের জন্য খুবই ভালো। যদিও মানুষ এ নিয়ে কমই জানে। প্যাশন ফুল ও ফল দুটোই দুর্দান্ত।’
তিনি আরো বলেন, লতানো জাতের এই ফলগাছ একবার সঠিকভাবে রোপণ করা হলে ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল দিতে পারে।
রংপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মোছা. মোকররমা শিল্পীর মতে, যথাযথ যত্ন পেলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্যাশন ফলের চাষ সম্ভব। তবে এ জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এবার আমাদের এখানে (রংপুরে) সুন্দর ফল হয়েছে। আমরা চারা উৎপাদন করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করি। রৌদ্রোজ্জ্বল ও উঁচু জায়গায় এটি ভালো হয়। এবার দেখছি প্রচুর ফুল ও ফল আসছে।’
মোকররমা শিল্পী জানান, গাছ লাগানোর প্রায় আট থেকে দশ মাস পর প্রথম ফুল ফোটে। ফুল ফোটার ৬০ থেকে ৭৫ দিন পর ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। প্রথম বছরে প্রতিটি গাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি ফল পাওয়া যায়। তবে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছর থেকে ফলের সংখ্যা বেড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি পর্যন্ত হতে পারে।
বাজার সীমিত, সম্ভাবনা জুসশিল্পে
বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় কাঁচা প্যাশন ফল লবণ দিয়ে বিক্রি হতে দেখা যায়। তবে এসব এলাকার বাইরে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে ফলটির চাহিদা এখনো খুব বেশি নয়।
কৃষিবিদ তালহা মাসরুর জোবায়ের মনে করেন, প্যাশন ফল বা আনারকলির বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর বাজার এখনো সীমিত। স্বাদ ও খাওয়ার ধরনের কারণে এটি অন্যান্য প্রচলিত ফলের মতো ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি।
তিনি বলেন, ফলটির সংরক্ষণকাল তুলনামূলক কম। ফলে বাজারজাতকরণে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে জুস ও পানীয়শিল্পে এর বড় সম্ভাবনা আছে। এর স্বতন্ত্র স্বাদ, সুগন্ধ ও অম্লতা প্রক্রিয়াজাত পানীয় তৈরির জন্য বিশেষ উপযোগী।
তালহা মাসরুর জোবায়েরের মতে, শুধু তাজা ফল বিক্রির ওপর নির্ভর না করে জুস, পাল্প ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজার গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশে প্যাশন ফলের বাণিজ্যিক চাষ লাভজনক হতে পারে।
৩৩ শতক জমিতে চাষ, প্রথম বছরেই বিক্রি ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের কৃষক মো. সজল প্যাশন ফল চাষ করে এলাকায় পরিচিতি পেয়েছেন। কয়েক বছর আগে কক্সবাজারে গিয়ে ফলটি দেখে চাষে আগ্রহী হন তিনি।
সজল বলেন, ‘কয়েক বছর আগে কক্সবাজার গিয়ে ফলটি দেখেছিলাম। একটা ফল ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়। গত বছর নিজেই চাষ শুরু করলাম ৩৩ শতক জমিতে। এখন প্রতি দুই তিন দিন পর গড়ে ১ হাজার পিস ফল তুলি।’
তিনি জানান, ৩৩ শতক জমিতে প্যাশন ফল চাষের উপযোগী করতে তার প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। প্রথম বছরেই তিন থেকে চার লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
সজল বলেন, ফলটি শুধু ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পাওয়া যায় না। বছরের বাকি সময়েও ফল আসে। তার এলাকায় এখন অনেকেই এ ফল চাষ করছেন। অনলাইনে দেখে অনেকে তার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করছেন। পাইকারেরা প্রতি ফল ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে কিনছেন বলেও জানান তিনি।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, প্যাশন ফল দ্রুত পচনশীল হলেও অল্প জমিতে বেশি ফলন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্যও এটি লাভজনক বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। তবে ফলটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজার গড়ে তোলার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
এএম