প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে এখন নতুন করে নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এ ব্যাপারে জনগণকে সজাগ থাকতে হবে। বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন যারা অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইছে, খবর নিয়ে দেখুন, ৫ আগস্টে যারা বিতাড়িত, তাদের সঙ্গে এরা তলে তলে আবার খাতির শুরু করেছে। যেভাবে ’৯৬ সালে করেছিল, যেভাবে ’৮৬ সালে করেছিল। তাদের সঙ্গে নতুন কয়েকটি লেজও গজিয়েছে।
গতকাল শনিবার বিকেলে ময়মনসিংহের ত্রিশালের কানহর এলাকায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ ধরার খাল পুনঃখননকাজ উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনের সংসদ সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান লিটনের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ও প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ত্রিশাল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এনামুল হক ভুঁইয়া।
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে সরকার গঠন করতে দেওয়ার পর একটি গোষ্ঠী এখন অস্থির হয়ে উঠেছে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত করতে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, যারা দেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে, তারা কৃষকের কথা বলে না, খাল খননের কথা বলে না, গ্রামের শিশুর শিক্ষা কিংবা কৃষক কার্ডের কথা বলে না। তারা শুধু অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধরার খাল শুধু একটি খাল নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। খালটি পুনঃখনন সম্পন্ন হলে অন্তত ৪ হাজার ৩০০ কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, প্রায় ৪৫ বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজেও এ খাল খনন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন। যাদের বয়স ষাটের বেশি, তাদের অনেকেরই সেই স্মৃতি এখনো মনে থাকার কথা।
প্রধানমন্ত্রী জানান, পুরো ময়মনসিংহে প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের প্রয়োজন রয়েছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার এসব উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
শিক্ষা খাতে নতুন উদ্যোগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে গ্রামীণ অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নতুন স্কুল ড্রেস ও স্কুল ব্যাগ বিতরণ করা হবে।
তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। নতুন নতুন টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও চালু করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি জনগণের ভাগ্যের উন্নয়নে কাজ করতে চায়। কিন্তু এখন আমাদের বিরুদ্ধে নতুন করে নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এ ব্যাপারে জনগণকে সজাগ থাকতে হবে। ৫ আগস্ট পতিত স্বৈরাচারকে বিদায় করেছি। একটি গোষ্ঠীকে বর্তমানে তাদের সঙ্গে মিল দেখা যায়। গোপনে তাদের যোগাযোগও রয়েছে। এসব ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সজাগ দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সম্প্রতি রামিসা হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনে যে অপরাধী তার শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু একটি শ্রেণি এই বিষয়কে ইস্যু করে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়। কিন্তু তারা জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে কোনো কথা বলে না।
তারেক রহমান আরো বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করায় তাদের জ্বালা ধরেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে সব ঘটনা ঘটেছে, আপনারা তাদের সেই সময় কিছু বলতে দেখেছেন, প্রতিবাদ করতে দেখেছেন? করেননি। কারণ তারা বিএনপির সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে চায়। বিএনপি সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা নষ্ট হলে জনগণের ক্ষতি হবে, আপনাদের ক্ষতি। তাই এদেরকে আপনাদেরও প্রতিহত করতে হবে।
এর আগে দুপুর দুইটায় মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছলে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। পরে খালে নেমে শ্রমিকদের সঙ্গে নিজে মাটি কাটায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় হাজার হাজার জনতা প্রধানমন্ত্রীর এ সরলতা দেখে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
রামিসা হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তির আশ্বাস
রাজধানীর মিরপুরে শিশু রামিসা হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের শিশু বা নারী নির্যাতন বর্তমান সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না। আগামী এক মাসের মধ্যেই হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে এবং সেই শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করার সাহস না পায়। গতকাল বিকালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে একথা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, এই ঘটনা দেশের মানবিক মূল্যবোধের ভয়াবহ অবক্ষয়ের প্রমাণ। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসন দেশের বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক-ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধ্বংস করেছে। নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে শিশু হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু গোষ্ঠী দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাস্তা অবরোধ, যানবাহন বন্ধ, আগুন ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করতে চাইছে।
তিনি বলেন, অরাজকতা সৃষ্টি হলে খাল পুনঃখনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-খতিবদের সম্মানী এবং শিশুদের স্কুল ড্রেস বিতরণসহ সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে।
নজরুল জয়ন্তীর রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় দুই দশক পর পুনরায় রাষ্ট্রীয়ভাবে নজরুলজয়ন্তী উদযাপন করতে পেরে সরকার গৌরববোধ করছে। একই সঙ্গে ত্রিশালকে ‘নজরুল স্মৃতি সিটি’ হিসেবে ঘোষণা করা যায় কি না, সে বিষয়ে সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও পর্যটন বিভাগের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও কাজী নজরুল ইসলাম অবিভাজ্য সত্তা। তিনি আমাদের জাতীয় সত্তার সার্থক প্রতিনিধি, জাতীয় চেতনার প্রতীক এবং জাতীয়তাবাদের প্রতীক।
প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করে বলেন, ২০০৬ সালের পর থেকে ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে নজরুলজয়ন্তী উদযাপন হয়নি। এ সময় তিনি মরহুম দারোগা রেজাউল্লাহর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তারেক রহমান বলেন, কবি নজরুল ইসলামকে ত্রিশালের কাজির শিমলা গ্রামে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন এ মানুষটিই।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নজরুলপ্রেমের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৭৬ সালে জাতীয় কবির জানাজার পর লাশবাহী খাটিয়া বহনকারীদের মধ্যে জিয়াউর রহমান অন্যতম ছিলেন। এছাড়া ১৯৭৯ সালে কবির জন্মজয়ন্তীর র্যালিতেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কাজী নজরুল মানেই বাংলা সাহিত্যে নতুন ভোরের উদয়। তিনিই কবিতায় এনেছেন যুদ্ধের গর্জন ও আত্মিক স্বাধীনতার বজ্রনিনাদ। তিনি নজরুলকে নারী অধিকার, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে অভিহিত করেন।