অল্প সময়ে অধিক বৃষ্টি
রাজধানীতে সোমবার অল্প সময়ে অধিক বৃষ্টি হয়েছে। সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত রাজধানীতে ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এরমধ্যে দুপুর ১২টা থেকে একটার মধ্যেই রাজধানীতেই ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।
কোনো এলাকায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে তাতে ভারী বৃষ্টি ধরা হয়। এদিকে সোমবার রাজধানীতে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। মাত্র এক ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। সড়ক তলিয়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল, মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ে অনেক যানবাহন। এতে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও ঈদযাত্রার যাত্রীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে।
রাজধানীর নিউমার্কেট নীলক্ষেত–আজিমপুর–কবরস্থান সংলগ্ন সড়ক এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মগবাজার মধুবাগেও ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলে ওই এলাকা দিয়ে চলাচলে ভোগান্তিতে পড়েন মানুষ। এছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঈদে ঘরমুখো মানুষসহ বিভিন্ন কাজে বের হওয়া মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
ভারি বর্ষণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর অংশে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে মহাসড়কের ভোগড়া বাইপাস, কুনিয়া, বড়বাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায়। এতে যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বৃষ্টির কারণে অন্যান্য মহাসড়কেও তীব্র যানজটের খবর পাওয়া গেছে। অল্প সময়ে অধিক বৃষ্টি হওয়ায় রাজধানীর অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে স্বস্তির মধ্যেও অস্বস্তি দেখা দেয়। ঈদ যাত্রায় ও পশুরহাটগুলোতে এর নেতিবাচক প্রভাব ছিল।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্ষা আসার আগের এই সময়ে দেশের আবহাওয়ায় এমন আচরণ খুবই স্বাভাবিক। মে মাসের শেষ নাগাদ দেশে দক্ষিণ-পশ্চিমা মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা প্রবেশ করার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এই সময়ে হঠাৎ করেই আকাশে কালোমেঘ জমে ঝুমবৃষ্টি হতে পারে; পরক্ষণেই আবার ভ্যাপসা গরম দেখা দেয়।
হঠাৎ করে অল্পসময়ে এতো বৃষ্টিকে কালবৈশাখী ঝড় ও ব্রজবৃষ্টি বলে আখ্যায়িত করেছেন আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক। তিনি বলেন, আগামী তিনদিনই রাজধানীতে এমন হঠাৎ বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে খুব বেশি বৃষ্টি সম্ভাবনা নেই। বৃষ্টির পরপরই ভ্যাপসা গরম দেখা দিতে পারে।
এদিকে পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে দেশের আবহাওয়ায় এক বৈচিত্র্যময় রূপ দেখা যেতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঈদের দিন দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে বৃষ্টিপাত কমে সেখানে মৃদু তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমের কারণে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে রাজধানীতে মঙ্গলবার থেকে আগামী তিনদিনই হঠাৎ বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
ঈদের দিনের আবহাওয়া পরিস্থিতির পূর্বাভাসে সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী ২৮ মে বৃহস্পতিবার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা কিংবা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজস্রহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক আমার দেশকে বলেন, ঈদের আগের দিন ও পরের দিন সারাদেশেই বিচ্ছিন্নভাবে বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। তবে ঈদের দিন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হলেও রাজধানীসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে বৃষ্টি কমে মৃদু তাপপ্রবাহসহ ভ্যাপসা গরম থাকতে পারে। আগের রাতে বৃষ্টি হলে গরমের মাত্রা কমতে পারে। তবে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে এবং গতিবেগ কমে যাওয়ায় সারাদেশেই ভ্যাপসা গরমের তীব্র অনুভুতি থাকতে পারে।
তবে আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক আমার দেশকে বলেন, মাঝারি ধরনের বৃষ্টিতে রাজধানীবাসীর মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও তা বেশি সময় ধরে স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। জ্যৈষ্ঠের খরতাপ আর ভ্যাপসা গরম জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, বৃষ্টির পরিমাণ বেশি না হলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যায়; এতে গরম আরো বেশি অনুভূত হয়। কেননা শরীরের ঘাম শুকাতে দেয় না। ফলে রাজধানীসহ সারাদেশে সহসাই গরম কমার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে হঠাৎ বৃষ্টিতে সাময়িক স্বস্তি দিলেও পরক্ষণেই ফের ভ্যাপসা গরম দেখা দিতে পারে। এছাড়া ঈদের ছুটির দিনগুলোতেও দেশজুড়ে ভ্যাপসা গরমের দাপট অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
আগের দিন ২০ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেলেও সোমবার খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও লক্ষ্মীপুর জেলাসমূহের উপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। সোমবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে লক্ষীপুরের রামগতিতে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন রাজধানীর তাপমাত্রা ছিল ৩২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা আগের দিনের তুলনায় তাপমাত্রা কমেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সোমবার রাজধানীতে ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। রোববার বিকাল থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ১৭ মিলিমিটার। এর আগে গত শুক্রবার রাজধানীতে ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। এছাড়া সোমবার সারাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে নোয়াখালীর মাইজদী কোর্টে ৯৫ মিলিমিটার। এছাড়া নেত্রকোনায় ৭৮, সিলেটে ৭৭, চাঁদপুরে ৭৫, বগুড়ায় ৬৯, নওগাঁয় ৫৪, ময়মনসিংহে ৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে বৃষ্টি কমে এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে ভ্যাপসা গরম ও অস্বস্তি অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝোড়ো সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মে মাসের শেষের এই সময়ে স্থানীয়ভাবে মেঘ তৈরি হয়ে হুটহাট বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা থাকে। তাই ঈদের দিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সাথে ছাতা বা রেইনকোট রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ঈদের দিন সকালের দিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টির বেগ বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দেশের প্রধান প্রধান ঈদগাহ ও খোলা ময়দানে ঈদের জামাত আয়োজন বিঘ্নিত হতে পারে। বৈরী আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে সারা দেশের জেলা-উপজেলা প্রশাসনকে খোলা মাঠের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে নিকটস্থ মসজিদগুলোকে প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় ঈদগাহ ময়দানেও বৃষ্টি নিরোধক বিশেষ শামিয়ানার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পবিত্র ঈদুল আজহার মূল আনুষ্ঠানিকতা অর্থাৎ পশু কোরবানির ক্ষেত্রে বৃষ্টি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের উন্মুক্ত স্থানের পরিবর্তে যথাসম্ভব ছাউনিযুক্ত স্থানে বা নিরাপদ আশ্রয়ে পশু জবাই করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সাথে, বৃষ্টির পানির সাথে কোরবানির রক্ত ও বর্জ্য মিশে যাতে পরিবেশ দূষণ বা জলাবদ্ধতা তৈরি না হয়, সেদিকে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে বাড়তি নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এএস