হোম > জাতীয়

শেখ মুজিব ফ্যাসিবাদের আইকন: মাহমুদুর রহমান

স্টাফ রিপোর্টার

শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদের আইকন বলে মন্তব্য করেছেন ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। মঙ্গলবার (১৬ জুন) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে সংবাদপত্রের কালো দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টসের (বিএজে) উদ্যোগে ‘আওয়ামী শাসনে গণমাধ্যম ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।

মাহমুদুর রহমান বলেন, শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু করেছিলেন আব্দুস সালামের মতো কিংবদন্তি সম্পাদকের চাকরিচ্যুতির মাধ্যমে। বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের ইতিহাস হচ্ছে অটোক্রেসি থেকে ফ্যাসিবাদের ইতিহাস। গণতন্ত্র থেকে ফ্যাসিবাদের ইতিহাসই হচ্ছে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের ইতিহাস। শাসক শেখ মুজিবকে আমি দুই ভাগে ভাগ করি। একজন শেখ মুজিব পাকিস্তানি আমলের শেখ মুজিব, আরেকজন স্বাধীন বাংলাদেশের শেখ মুজিব। আমার কাছে স্বাধীন বাংলাদেশের শেখ মুজিব ফ্যাসিবাদের আইকন। ফ্যাসিবাদের নিয়ম হচ্ছে, তাদের একটি আইকনের প্রয়োজন হয় ফ্যাসিবাদকে বৈধতা দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশে যারা আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে যাচ্ছে, মহান জুলাই বিপ্লবের পর থেকে তারা সব সময় শেখ মুজিবকে শেখ হাসিনার থেকে পৃথক করার চেষ্টা করছে। আসলে শেখ মুজিবের সঙ্গে শেখ হাসিনার কোনো পার্থক্য নেই।

মুজিব-হাসিনার কেন পার্থক্য নেই, এর ব্যাখ্যায় মাহমুদুর রহমান বলেন, শেখ মুজিব ক্ষমতায় ছিলেন সাড়ে তিন বছর। হাসিনা সর্বমোট ২০ বছরের অধিক সময় ক্ষমতায় ছিলেন। দীর্ঘতম সময়। শেখ মুজিব যদি ২০ বছর সময় পেতেন, হাসিনাকে ফ্যাসিবাদ শিখিয়ে দিতেন। বাবা ও মেয়ের আরেকটি মিল দেখুন। তাদের সময়ে সর্বদা মিডিয়া চাটুকার তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। আপনারা যারা শিক্ষিত এই প্রজন্ম, তারা চাটুকারিতা দেখেছেন ১৫ বছর। আর আমরা আগের চাটুকারিতা দেখেছি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। আমি আপনাদের বলছি, ওই চাটুকারিতা এবং বর্তমানের চাটুকারিতার কোনো পার্থক্য নেই। একই রকম চাটুকারিতা বন্যার সময় করা হয়েছে, দুর্যোগের সময় করা হয়েছে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের নামে কীভাবে চাটুকারিতার প্রতিযোগিতা করে দেওয়া হয়েছিল।

ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পুনর্বাসনের চেষ্টায় লিপ্তদের সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, সুতরাং আজ যারা শেখ মুজিবকে হাসিনার থেকে ভালো রাজনীতিবিদ ও ভালো মানুষ প্রমাণ করে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চায়, তাদের আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই—শেখ মুজিব আমার কাছে একজন ফ্যাসিবাদের আইকন ছাড়া কিছু নন। ফ্যাসিবাদের আইকনকে পুনর্বাসিত করার কোনো সুযোগ নেই।

১৬ জুন কালো দিবস উদযাপন নিয়ে তিনি বলেন, ১৬ জুন হচ্ছে জাতির কাছে শেখ মুজিবের উপহার। সেই উপহার হলো জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার উপহার। একই সঙ্গে আমাদের স্বাধীন কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করে দেওয়ার উপহার। আমাদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং মানবাধিকারও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা ১৫ বছরে যতগুলো দুষ্কর্ম করেছেন, তার শুরুটা শেখ মুজিব করেছিলেন ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে।

রক্ষী বাহিনীকে র‍্যাবের পিতা আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আজকে আমরা র‍্যাব নিয়ে কথা বলি, রক্ষী বাহিনীকে ভুলে যাই কেন? রক্ষী বাহিনী হচ্ছে র‍্যাবের পিতা। এটা ভুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি যখন বুয়েটের ছাত্র, তখন ছিল শেখ মুজিবের শাসনামল। তার ও তার পাণ্ডাদের কীর্তি-কলাপ আমি দেখেছি। আমি দেখেছি, শেখ মনি কীভাবে একটি উর্দু পত্রিকা (পয়গাম)-এর ভবন দখল করে বাংলার বাণী বানিয়ে ফেলেছিলেন।

এ সময় সাংবাদিকদের চাটুকারিতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান আমার দেশ সম্পাদক। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আপনাদের মনে আছে, শেখ হাসিনার গণভবনে কৃষিকাজের ওপর একটি বড় টেলিভিশন চ্যানেলে কী বিশাল অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। যিনি অনুষ্ঠান করেছিলেন, তিনি আবার দেখবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের পাশে গিয়ে হাজির হয়ে যাবেন। এটাই বাংলাদেশের সাংবাদিকদের চরিত্র হয়ে গেছে। তাহলে সাংবাদিকদের এই চরিত্রেরও পরিবর্তন দরকার। আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এই চরিত্রের পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের আত্মসমালোচনা করা দরকার যে, আমরাও তো আমাদের দায়িত্ব ও সম্মান রাখতে পারি না। দুর্ভাগ্যবশত তেলবাজি থেকে আমরা মুক্ত হতে পারি না। তেলবাজি করতে করতে রাজনীতিবিদরাও একসময় তেল পছন্দ করতে শুরু করেন। যারা তেল দেয় না, তাদেরও অপছন্দ করতে শুরু করেন। এটাই রাজনীতিবিদদের চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়। এখান থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যেদিন আমরা আত্মসমালোচনা করে মেরুদণ্ড সোজা করে রাজনীতিবিদদের বলতে পারব যে, আপনারা দয়া করে পেশাগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন না, সেদিন সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আসবে। এখন সেই স্বাধীনতা কারা আনবে? দিনের মধ্যে তিনবার সম্পাদক পরিবর্তন যারা করে, তারা স্বাধীনতা আনবে? এটা সম্ভব নয়। সুতরাং আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। অলিগার্কদের মিডিয়া কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করব, সে কথা আমরা জানি না। কারণ অলিগার্করা তাদের নিজেদের স্বার্থে মিডিয়া পরিচালনা করে। কিন্তু আমরা অন্তত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে পারি।

সবশেষে মাহমুদুর রহমান বলেন, মিডিয়ার কাজ হলো প্রশ্ন করা। এই প্রশ্ন করার স্বাধীনতার সঙ্গে আপনারা কখনো আপস করবেন না। একজন সিনিয়র সহকর্মী হিসেবে এটাই আপনাদের প্রতি আমার পরামর্শ—প্রশ্ন করা একজন সাংবাদিকের অধিকার। এই অধিকারের সঙ্গে কখনো আপস করবেন না।

বিএজের সভাপতি ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এম. আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।

এতে ‘আওয়ামী শাসনে গণমাধ্যম ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট কলাম লেখক এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম।

প্রবন্ধে তিনি বলেন, ইতিহাসের একটি নির্মম বৈশিষ্ট্য হলো—ক্ষমতা যখন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তার পতনের সূচনা হয় নীরবে; কিন্তু সেই পতনের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয় বহু দূর পর্যন্ত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক শক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে জনগণের সম্মতি, সামাজিক বৈধতা এবং তথ্যপ্রবাহের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর ‘হেজিমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য তত্ত্বে দেখিয়েছেন, একটি শাসকগোষ্ঠী কেবল বুলেটের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকে না; তাদের প্রয়োজন হয় মতাদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্রের, যার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো গণমাধ্যম। যখন এই রাষ্ট্রীয় বয়ান এবং জনগণের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার মধ্যে এক গভীর ও অলঙ্ঘনীয় ব্যবধান সৃষ্টি হয়, তখন রাজনৈতিক সংকট অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই চিরন্তন সত্যকেই নতুনভাবে এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আজ ২০২৬ সালের জুন মাসে দাঁড়িয়ে, যখন আমরা জুলাইয়ের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দ্বারপ্রান্তে, তখন আন্দোলনের নানা মাত্রা—শহীদদের স্মৃতি, রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস কিংবা ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন—নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এর সমান্তরালে একটি মৌলিক প্রশ্ন এখনও তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত গভীরতা পায়নি: আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে মূলধারার গণমাধ্যমের ভূমিকা কী ছিল এবং জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরিতে সেই ভূমিকা কতটা দায়ী?

অধ্যাপক মাসুম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণ। এর চূড়ান্ত ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন হয়তো সময়ই করবে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক সত্য ইতোমধ্যে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—যখন গণমাধ্যম জনগণের ভাষা হারিয়ে ফেলে, তখন জনগণ রাজপথে নিজেদের নতুন ভাষা তৈরি করে নেয়; যখন গণমাধ্যম বাস্তবতাকে ব্ল্যাকআউট করতে চায়, তখন বাস্তবতা নিজেই ইতিহাস হয়ে স্বৈরাচারের সামনে এসে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ আজ এক নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক যাত্রার প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে। সামনে নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং নতুন বন্দোবস্তের রূপরেখা। এই যাত্রাপথে একটি স্বাধীন, নির্ভীক ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম অপরিহার্য। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি শুধু নির্দিষ্ট সময় পরপর ভোট দেওয়ার মধ্যে নিহিত নয়; তা নিহিত রয়েছে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে নিঃশঙ্কচিত্তে সত্য বলার ও শাসককে প্রশ্ন করার সাহসের মধ্যে।

তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের বারবার এই কথাই মনে করিয়ে দেয়—ক্ষমতার দম্ভে সত্যকে হয়তো সাময়িকভাবে দমন করা যায়, কিন্তু তাকে কখনো পরাজিত করা যায় না। ইতিহাসের প্রতিটি সফল গণআন্দোলনের মতো ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানও প্রমাণ করেছে যে, শোষিত মানুষের যৌথ অভিজ্ঞতা ও সত্যের নৈতিক শক্তি যেকোনো আধুনিক ও দানবীয় প্রচারণা যন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। সুতরাং জুলাই ২০২৬-এর এই ক্ষণে আমাদের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—আমরা কি অতীত থেকে শিক্ষা নেব, নাকি আবারও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করব? গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মূলত এই একটি প্রশ্নের সততাপূর্ণ উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে।

এসআর

সংসদ কক্ষে প্রবেশের ক্ষেত্রে মাথা ঝোঁকানো নিয়ে আপত্তি জামায়াত এমপির

হামে আরো এক শিশুর মৃত্যু, নতুন করে আক্রান্ত ১১৪২

বিশ্বকাপে কোন দলের সমর্থক, জানালেন প্রধানমন্ত্রী

আগে রাষ্ট্র গণমাধ্যমকে চোখ রাঙাত, এখন সমস্যা সমাধানে ‘সহযোগী’ হতে চায়

ক্ষতিকর জাল উৎপাদন বন্ধে অভিযানের নির্দেশ

বাংলাদেশ বিকিয়ে দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এই সরকার কখনো করবে না

৭ হাজার ৩ কোটি টাকার পাঁচ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন

ভারতের সঙ্গে যৌক্তিক সম্পর্ক করতে চায় ঢাকা

আদ্‌-দ্বীনের নির্বাহী পরিচালক কে এই জামালুন্নেসা

শিক্ষার ৪ স্তম্ভে আমূল পরিবর্তন আনা হবে: গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী