হোম > জাতীয়

ন্যাশনাল এনার্জি পলিসি মানছে না বিপিসি

৬০ দিনের জ্বালানি মজুতের নিয়ম থাকলেও বাস্তবায়ন নেই

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম

ছবি: সংগৃহীত।

ন্যাশনাল এনার্জি পলিসিতে দেশে ৬০ দিনের জ্বালানি মজুতের নিয়ম থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এক সময় বিপিসির সক্ষমতা সীমিত থাকলেও বর্তমানে সে সক্ষমতা রয়েছে সংস্থাটির। কিন্তু বিপিসি সেটি বাস্তবায়নের প্রয়োজন মনে করেনি। তাদের এমন কর্মকাণ্ডে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার শুরুতেই দেশে তীব্র আকার নিয়েছে তেলের সংকট।

সূত্র জানায়, ২০০৪ সালে ন্যাশনাল এনার্জি পলিসি গ্রহণ করে তৎকালীন বিএনপি সরকার। তখন থেকেই আপৎকালীন ব্যবহারের জন্য ‘কৌশলগত মজুত’ হিসেবে ৬০ দিনের জ্বালানি মজুত রাখার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়। যদিও সে সময় ৬০ দিনের জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা ছিল না বিপিসির। ২০২০ সালে ৬০ দিনের জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে সব ডিপো ব্যবহার করলে তিন মাসের জ্বালানি মজুত রাখা সম্ভব। কিন্তু কাগজ-কলমে থাকা এ পলিসিটি বাস্তবায়নে কখনোই মনযোগী হয়নি বিপিসি।

বিপিসি জানায়, তিনটি বিপণন প্রতিষ্ঠান, ইস্টার্ন রিফাইনারি ও এসপিএম প্রজেক্টের স্টোরসহ সম্মিলিতভাবে জ্বালানি তেলের মজুত ক্ষমতা ১৫ লাখ ৮১ হাজার মেট্রিকটন। এর মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বড় মজুতের সক্ষমতা আছে ইস্টার্ন রিফাইনারির। পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল মিলে প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ লাখ ২১ হাজার টন তেল মজুত করতে পারে। এর বাইরে পদ্মা অয়েল কোম্পানি তিন লাখ আট হাজার, মেঘনা পেট্রোলিয়াম দুই লাখ ৪৬ হাজার, যমুনা অয়েল কোম্পানি দুই লাখ ২৭ হাজার টন তেল মজুত করতে পারে।

এছাড়া কক্সবাজারের মহেশখালীতে ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’-এ পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলে আরো দুই লাখ ৪০ হাজার টন তেল মজুতের সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে বিপিসির বহরে। অপারেশন প্রতিষ্ঠানের জটিলতায় এসপিএম এখনো চালু না হলেও জরুরি পরিস্থিতিতে এসপিএমএর স্টোরেজ ব্যবহার করার সুযোগ আছে।

দেশে বেশি চাহিদাসম্পন্ন জ্বালানি তেল ডিজেলের দৈনিক গড় চাহিদা ১২ হাজার টনের কিছু বেশি। অকটেন ও পেট্রোলের গড় চাহিদা প্রায় তিন হাজার টন। গড়ে দেশের লোকাল বাজারে দৈনিক ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। সেই হিসাবে সব স্টোর একসঙ্গে কাজে লাগালে ৯০ দিনের বেশি জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা আছে বাংলাদেশের। কিন্তু সেই সক্ষমতা কখনোই কাজে লাগায়নি বিপিসি। ২৫ থেকে ৩০ দিনের মজুত নিয়েই সব সময় সন্তুষ্টির ঢেকুর তুলেছে রাষ্ট্রীয় এই জ্বালানি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানটি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলা শুরু হলে ৩ মার্চ থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে ইরান। এরপর মার্চ মাসেই দুইবার মজুতের তথ্য প্রকাশ করে বিপিসি। প্রথমে ২০ থেকে ২৫ দিনের জ্বালানির মজুত আছে বলে জানায় বিপিসি। পড়ে ২৪ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বিপিসি জানায়, দেশে এক লাখ ৭৫ হাজার টন ডিজেল ও ২৬ হাজার টন অকটেন পেট্রোলের মজুত রয়েছে। ফলে ডিজেলে ১৪ দিন ও পেট্রোল জাতীয় জ্বালানি দিয়ে ১৮ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। এরপর আরো কয়েকটি জাহাজে করে জ্বালানি তেলের চালান এলেও মজুতের পরিমাণ আর বাড়েনি।

এদিকে পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এতে প্যানিক বায়িংয়ের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় গোঁজামিল দেওয়ার চেষ্টা করছে বিপিসি। প্রতিদিন জ্বালানিবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়ছে এমন খবর প্রচার করে আতঙ্ক কমানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। মূলত কম ক্যাপাসিটি ব্যবহার করে আনা হচ্ছে জাহাজগুলো। এতে খরচ ও সিস্টেমলস দুটোই বাড়ছে।

জ্বালানি বিশ্লেষক বিডি রহমতুল্লাহ জানান, আমাদের পলিসি আছে বাস্তবায়ন নেই। সক্ষমতা আছে কিন্তু ব্যবহার নেই। মূলত অব্যবস্থাপনার কারণে এই অসঙ্গতিগুলো সামনে আসে। সরকারের সঙ্গে বিপিসির কোনো সমন্বয় আছে বলে মনে হয় না। হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব এড়ানোর সুযোগ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেরই নেই। তবে ২০০৪ সালের পলিসি ঠিকমতো মেনে মজুত বাড়ালে এত দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ত না। পাশাপাশি এই সময়ের মধ্যে বিকল্প সোর্সের দিকে সহজেই মনোযোগী হতে পারত। কিন্তু একেবারে অল্প সময়ের মধ্যে সংকট ঘনীভূত হওয়ায় সংকট মোকাবিলা ও তেলের যোগান এ দুটি স্পর্শকাতর কাজ একসঙ্গে করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছে সরকার।

বড় জাহাজে আসছে অল্প তেল

গত ১৭ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে হাই সালফার ফুয়েল অয়েল নিয়ে এসসি গোল্ড ওশান ও লেডি অব দরিয়া নামের দুটি জাহাজ আসে চট্টগ্রাম বন্দরে। এসসি গোল্ড ওশানে আনা হয় ২৫ হাজার টন ও লেডি অব দরিয়ায় আনা হয় ১৩ হাজার টন জ্বালানি তেল। অথচ বাংলাদেশি মালিকানাধীন জাহাজ লেডি অব দরিয়ার এককভাবে ধারণক্ষমতা রয়েছে ৪৬ হাজার ৮৪৬ টন।

একইভাবে গত ৮ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে ২০ হাজার টন হাই সালফার ফার্নেস অয়েল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে হাফনিয়া বাবকাট নামের একটি মাদার ভেসেল। একদিন পর ৯ মার্চ একই দেশ থেকে আরো ২০ হাজার টন হাই সালফার ফার্নেস অয়েল নিয়ে চট্টগ্রামে আসে ইল্যান্ড্রা স্প্রুস নামের একটি জাহাজ। দুটি জাহাজেরই ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার টন করে। চাইলে দুটি জাহাজের তেল একটি জাহাজেই পরিবহন করা যেত। এতে ব্যয় ও সিস্টেমলস দুটিই কমত।

একই দিন সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার ২০৪ টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে চীনের পতাকাবাহী জাহাজ জিউ চি। অথচ জাহাজটির ধারণক্ষমতা রয়েছে ৪৮ হাজার ৭৮১ টন। ১৩ মার্চ মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার ৪৮৪ ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রামে আসে পানামার পতাকাবাহী জাহাজ এসপিটি থেমিস। কিন্তু জাহাজটির ধারণক্ষমতা ছিল ৫০ হাজার ২৮৬ টন।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানান, ধারণক্ষমতার কম ব্যবহার করে কোনো পণ্য এলে তিন স্তরে থেকে লোকসানের মুখোমুখি হতে হয় আমদানিকারক দেশের। এর প্রথমটিই হলো জাহাজটি ভাড়া করার সময় পূর্ণ ক্যাপাসিটিতেই ভাড়া করতে হয়। এখানে ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজে ২০ হাজার টন আনলেও পুরো ৫০ হাজার টনের ভাড়া পরিশোধ করতে হয়।

দ্বিতীয়টি হলো জাহাজ থেকে তেল আনলোড করার সময় একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাণ তেল সিস্টেমলস হয়। জাহাজের পরিমাণ বেশি হলে সিস্টেমলসও বেশি হয়। তৃতীয় কারণটি হলো, জাহাজের সংখ্যা বাড়লে বহির্নোঙ্গরে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। একটি জাহাজ একদিন অলস দাঁড়িয়ে থাকলে ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হয় আমদানিকারককে।

বিকল্প উৎস নিয়ে প্রশ্ন­

মূলত জি টু জি বা সরকার টু সরকার চুক্তির মাধ্যমে ও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান এই দুই পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সংকট ঘনীভূত হওয়ায় এবার সাপ্লাই চেইন স্বাভাবিক রাখতে এই দুই প্রচলিত নিয়মের বাইরে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তেল কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে নতুন নতুন দেশ ও সাপ্লাইয়ার প্রতিষ্ঠান তেল সরবরাহের আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু এসব উৎস অপ্রচলিত হওয়ায় তেল পাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে কাজাখস্তানের তেল নিয়ে। কাজাখ গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্টের কাছ থেকে এক লাখ টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। কিন্তু ল্যান্ডলক দেশ হওয়ায় সেখান থেকে তেল আসবে কোনো প্রক্রিয়ায় তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। এছাড়া মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বেশকিছু সাপ্লাইয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বিকল্প উপায়ে তেল সংগ্রহ নিয়ে।

বিপিসির অপারেশন বিভাগের জিএম মোর্শেদ আজাদ জানান, জ্বালানি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মিডিয়ায় কথা বলতে উপর থেকে নিষেধ করা হয়েছে। তিনি বরং বিপিসির চেয়ারম্যান অথবা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক পরিচালক জানান, সংকটের সময় বেশি দামে তেল সরবরাহ করতে একটি মহল তৎপর। তারা বিভিন্ন নামে-বেনামে আন্তর্জাতিক সাপ্লাইয়ারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে থার্ড পার্টি হয়ে তেল সরবরাহের প্রস্তাবনা পাঠাচ্ছে। এদের অনেকে অর্ডার পেলেও তেল সরবরাহ করতে পারবে না।

সরকার এই বিষয়টিও ভালোভাবেই জানে। তাই তেল সরবরাহের প্রস্তাবনাগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।

ইরান যুদ্ধে নিহত প্রবাসী শাহ আলমের লাশ ঢাকায়

সাবেক এমপি সাফুরা বেগম রুমী গ্রেপ্তার

গ্রেপ্তার এড়াতে চারবার বাসা বদলান শিরীন শারমিন

ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের সতর্ক করল প‌শ্চিমা ১৩ দেশ

হামে মৃত্যু দেড়শ ছাড়াল

সেমিনারে শিক্ষামন্ত্রী: স্কুলে গিয়েই অনলাইন ক্লাস নিতে হবে শিক্ষকদের

পার্লামেন্টে তেল থাকলে কী হবে, পাম্পে তেল পাই না

দেশের বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাস

ঢামেকে শিক্ষার্থী-চিকিৎসক সংঘাত, ৩ ঘণ্টা পর জরুরি সেবা চালু

উড্ডয়নের আগে অসুস্থ যাত্রী, রানওয়ে থেকে ফিরে এলো বিমানের ফ্লাইট