নিরপেক্ষ মজুরি বোর্ড যৌক্তিক ও ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।
মজুরি বোর্ডের ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি সেখানে যারা শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তারা সম্পূর্ণ নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সবার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য, যৌক্তিক ও ন্যায্য মজুরি সুনিশ্চিত করবেন। ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনের পর অত্যন্ত দ্রুততার সাথে প্রথম বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী দ্বিতীয় বৈঠকের ঘোষণাও স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই দেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে নিবিড়ভাবে কাজ করে এই ডিসেম্বরের ভেতরেই পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হবে। আমরা বিশ্বাস করি, এতে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা হবে, পোশাক শিল্পের স্বার্থ রক্ষা হবে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত হবে।”
বুধবার রাতে সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে দেশের সার্বিক শ্রম পরিস্থিতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় জরুরি সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
শ্রমিকদের শ্রম ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড পরিচিতি পেয়েছে উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, “সরকার সবসময় সর্বোচ্চ মমত্ববোধ ও আন্তরিকতা নিয়ে তাদের পাশে থাকবে।”
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা আরও বলেন, “আজ সভায় শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিক প্রতিনিধি এবং সরকার—আমরা সবাই মিলে একসাথে বসেছি। কারণ এই দেশটাকে যদি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় এবং আমাদের তৈরি পোশাক খাতের (গার্মেন্টস সেক্টর) স্বার্থ রক্ষা করতে হয়, তবে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে কাজ করতে হবে।”
জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গার্মেন্টস সেক্টরের প্রতি একটি বিশেষ আন্তরিকতা ও আবেগ নিয়ে কাজ করছে জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, “ঐতিহাসিকভাবেই সবাই জানেন যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই বাংলাদেশে এই গার্মেন্টস সেক্টরের সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় এই খাতের সর্বাধিক উন্নয়ন ও বিকাশ সাধিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা অনুযায়ী আমরা দ্রুততম সময়ে মজুরি বোর্ড গঠন করেছি। আগে যা পাঁচ বছর পর পর হতো, এবার মাত্র তিন বছরের ব্যবধানেই আমরা নতুন মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করেছি।”
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “নির্বাচিত সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সেই ঐতিহাসিক অবদানকে ধারণ করে শ্রমিক, মালিক ও সরকার—এই তিন পক্ষ এক হয়ে কাজ করলে এই শিল্পের বিকাশ কেউ রুখতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ। আজকের বৈঠকে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ও সদিচ্ছা দেখা গেছে, আমরা চাই সেই একই পরিবেশ আমাদের প্রতিটি শিল্পকারখানাতেও বজায় থাকুক। আগামীকাল থেকেই আমাদের শ্রমিক ভাইবোনেরা স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগদান করবেন—এটিই আমাদের প্রত্যাশা। একই সাথে মজুরি বোর্ডের সাথে নিয়মিত সংলাপ ও পরামর্শ প্রক্রিয়াও পুরোদমে চলমান থাকবে।”
খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, “তবে পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এই গার্মেন্টস খাতকে অস্থিতিশীল করার একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের শান্তিকামী শ্রমিকদের মাঝে কিছু বহিরাগত এসে উসকানি দিচ্ছে এবং উত্তেজনা ছড়িয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কিছু সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনাও ঘটেছে, যার সাথে নিরীহ সাধারণ শ্রমিকরা কোনোভাবেই জড়িত নন।”
সবাইকে অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত ধৈর্য ও আন্তরিকতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে এবং তারা কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।”
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি পালাবদলে শ্রমিক সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। আসুন, সব বিভেদ ভুলে আমরা সবাই মিলে একটি সুন্দর, টেকসই ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে একযোগে কাজ করি।”
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জাতীয় সংসদের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রহমান তরফদার, তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ-র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ, গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ ও গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশুসহ মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।