পেশাদার ও রাজনীতিমুক্ত আমলাতন্ত্র ছাড়া দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন বিশিষ্ট সাবেক আমলা, গবেষক, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ বন্ধ করে মেধা, দক্ষতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে প্রশাসন পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি আয়োজিত ‘রাষ্ট্র গঠন ও আমলাতন্ত্র: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির প্রেসিডেন্ট ও সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ শরিফুল আলম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাফিউল ইসলাম। প্রবন্ধটি লিখেছেন গভর্ন্যান্স গবেষক ও সিভিল সার্ভিস বিশেষজ্ঞ ড. ইউসুফ জারিফ।
মূল প্রবন্ধে বিভিন্ন গবেষণার উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পেশাদার ও রাজনীতিমুক্ত আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলা হয়, মেধাকে উপেক্ষা করে কার্যকর আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
প্রবন্ধে ড. ইউসুফ জারিফ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই আইনগতভাবে আমলাতন্ত্রকে নতজানু করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ের শাসকরা আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিকীকরণ করেছেন। তার মতে, শাসক শ্রেণি নির্বাচনব্যবস্থা কুক্ষিগত করা এবং রাষ্ট্র ও সরকারি নীতিকে গোষ্ঠীস্বার্থে নিয়ন্ত্রণের জন্য আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিকীকরণ করে। জুলাই বিপ্লবের পরও রাজনৈতিকীকরণ ও মেধাকে উপেক্ষার নীতি চলমান রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আমলাতন্ত্রকে পেশাদার না করলে দেশে সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে সিভিল সোসাইটির একটি অংশ রাজনৈতিক অভিলাষ ও উন্নয়ন সহযোগীদের এজেন্ডার অংশ হিসেবে আমলাতন্ত্রকে দুর্বল করতে চায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মূল প্রবন্ধে আমলাতন্ত্রকে সুরক্ষা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—
১. বিভিন্ন দেশের মেরিট প্রটেকশন কমিশনারের আদলে বাংলাদেশে ‘সিভিল সার্ভিস ওমবাডসম্যান’ প্রতিষ্ঠা করা, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা প্রতিকার পান।
২. সচিব ও সংস্থাপ্রধান নিয়োগে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা। সরকার ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নৈতিকতা, সততা, আর্থিক অবস্থা, সম্পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিক দক্ষতা যাচাইয়ের প্রস্তাব করা হয়।
৩. বর্তমান সিনিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) কার্যকর নয় দাবি করে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া বা থাইল্যান্ডের মতো প্রশাসনিক কাঠামো বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি পদায়ন ও পদোন্নতির নীতিমালা স্পষ্ট করে তা জনসম্মুখে প্রকাশ এবং নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন গ্রহণ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
৪. পদোন্নতি পাওয়া বা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে জাতীয় সংসদে সংশ্লিষ্ট সরকারি দলের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপনের ব্যবস্থা করা। পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের কী কারণে বঞ্চিত করা হয়েছে, তা তথ্যের অধিকার হিসেবে তাদের জানানো।
৫. সিভিল সার্ভিসের জন্য বাধ্যতামূলক ‘নৈতিক ও জবাবদিহি নীতিমালা’ প্রণয়ন এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বিগত সরকারগুলো দলীয় স্বার্থে আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনে পরিণত করেছিল। এর ফলে দেশে নির্বিচারে অর্থ পাচার হয়েছে এবং নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে বলে তারা মন্তব্য করেন।
আমলাতন্ত্রকে জবাবদিহিমূলক, নৈতিক ও পেশাগত দক্ষতায় শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা। তাদের মতে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত আমলাতন্ত্র দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আলোচকেরা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পয়লস সিস্টেম’-এর অপব্যাখ্যা দিয়ে আমলাতন্ত্রে রাজনৈতিকীকরণ করা হচ্ছে। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া অনেক সচিবের চুক্তি বাতিল হলেও জনপ্রশাসন সচিব ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিবের চুক্তি বাতিল না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। তাদের মতে, এতে নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন ধরনের বার্তা যায়।
আমলাতন্ত্রকে পেশাদার করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান আলোচকেরা। সম্প্রতি বিভিন্ন সরকারি করপোরেশনে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়োগের বিষয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জনপ্রশাসনকে সরকারি দলের কার্যালয়ে পরিণত করা হলে তা দেশের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে উল্লেখ করে সরকারকে এ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তারা।
সংলাপে সাবেক সচিব ও গবেষক ড. মাহফুজুল হক, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খন্দকার রাশেদুল হক, সাবেক সচিব মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ূম, সাবেক সচিব মিজ আলেয়া আক্তার, সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম, দৈনিক ওয়াদার প্রধান সম্পাদক শফিকুল আলম, অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম বক্তব্য দেন।