অনেকে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে জনগণকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।
সোমবার দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার শাহাপাড়া খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে। বিভিন্ন রকম কথাবার্তা বলে কারা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। অনেকে আসে, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়। কিন্তু আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কৃষকের উপকার করা, মা-বোনদের স্বাবলম্বী করা এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করা।
খাল পুনঃখননে কৃষির বড় সুবিধা
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জানান, সাহাপাড়া খালটি প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ। খালটি পুনঃখনন শেষ হলে প্রায় ৩৩ হাজার কৃষক সেচ সুবিধা পাবেন এবং প্রায় ১২০০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। এতে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে।
তিনি বলেন, এই খালের পানির মাধ্যমে বর্তমানে উৎপাদিত ফসলের তুলনায় প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন বেশি ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে।
সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অনেক খাল-নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষায় পানি জমে বন্যা হয় আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দেখা দেয়। তাই সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা নিয়েছে।
তিনি বলেন, বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধরে রেখে কৃষিকাজে ব্যবহার করা হবে। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনও বাড়বে।
বৃক্ষরোপণ ও রাস্তা নির্মাণ
খাল পুনঃখননের পাশাপাশি খালের দুই পাশে প্রায় ৭ হাজার গাছ রোপণ করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুরোধে খালের পাশে রাস্তা নির্মাণের ব্যবস্থাও করা হবে, যাতে এলাকাবাসীর চলাচল সহজ হয়।
ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমানোর উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ডিপ টিউবওয়েলের মাধ্যমে গভীর থেকে পানি তুলতে হচ্ছে। আগে যেখানে ৫০ ফুটে পানি পাওয়া যেত, এখন অনেক জায়গায় ৩০০ ফুট বা তারও বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে। তাই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে ওপরের পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষকের জন্য ঋণ মওকুফ
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে প্রায় ২০ কোটি মানুষ। তাদের বেশিরভাগ গ্রামে বাস করে এবং কৃষির সঙ্গে জড়িত। কৃষক ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে।”
কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ
সরকার শিগগিরই কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। আগামী মাস থেকে এর পাইলট প্রকল্প শুরু হবে এবং ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।
মা-বোনদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের ৪ কোটি পরিবারের মায়েদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ৩৭ হাজার নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ রংপুর বিভাগের সব জেলায় এই কার্ড দেওয়া হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সেখানে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়েও সরকার উদ্বিগ্ন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী জানান, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং ঈদের পর তাদের নিয়ে বৈঠক করা হবে।
তিনি বলেন, এসব শিল্প গড়ে উঠলে এলাকার বেকার যুবক ও নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
জনগণই ক্ষমতার উৎস
বক্তব্যের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই দেশের মালিক জনগণ। জনগণের সমর্থন ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। নির্বাচনের সময় যেমন আপনারা ধানের শীষের পাশে ছিলেন, তেমনি দেশ গড়ার কাজেও আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
তিনি সবাইকে দেশ গড়ার কাজে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “করবো কাজ, গড়বো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ।”
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, শাহাপাড়া খালের পুনঃখনন কাজ শেষ হলে তিনি আবার সেখানে গিয়ে কাজের অগ্রগতি সরেজমিনে দেখবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন দোলাল।