চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্ব করে পার পাবে না।
তিনি আরো বলেন, বিএনপিতে চাঁদাবাজ ও দখলদারদের কোনো স্থান নেই। দলের সব পর্যায়ে ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। নেতাকর্মীরা যাতে কোনো অপরাধে জড়াতে না পারেন, সে বিষয়ে সংসদ সদস্যদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
রোববার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি জানান, সভায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সরকারি কার্যক্রমের জবাবদিহি, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা এবং সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্যসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারদলীয় সদস্যদের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। রাত সাড়ে ৯টায় সভা শেষ হয়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার বিষয়ে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, চাঁদাবাজ ও দখলদারদের কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। অন্যায় করে বিএনপির নাম ব্যবহার করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
তিনি বলেন, দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়ানো থেকে নেতাকর্মীদের বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, প্রত্যেককে নিজ নিজ এলাকায় বিশেষ নজর রাখতে হবে, যাতে দলের কোনো নেতাকর্মী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়েন।
একজন সংসদ সদস্য জানান, বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও সংসদ সদস্যদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, নিজ নিজ এলাকায় কেউ যাতে চাঁদাবাজি করতে না পারে, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। দলের কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
বৈঠকে দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সরকার ও দলের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংসদ সদস্যরা সংসদের ভেতরে ও বাইরে কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং সরকারের কার্যক্রমের সুফল কীভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন, সে বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনা দেন।
স্থানীয় নির্বাচন ও প্রার্থী বাছাই
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের জনপ্রিয়, যোগ্য ব্যক্তিদের প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কাউকে প্রার্থী করা যাবে না বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
বৈঠক শেষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সঠিক প্রার্থী বাছাই করতে হবে। মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা যাতে নির্বাচিত হতে পারেন, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাধারণত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্বাচন কমিশন আয়োজন করে থাকে। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রকৃত জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হতে পারেন, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চিফ হুইপ বলেন, নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হবে না। প্রকৃত অর্থে যিনি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য, তিনি যাতে নির্বাচিত হতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরো জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক বিস্তৃতি থাকায় এ ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। আগে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হতো। বিএনপি চায়, নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হোক এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান।
ডিসি-ইউএনওদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, কয়েকজন সংসদ সদস্য নিজ নিজ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিসি ও ইউএনওরা সংসদ সদস্যদের কথা শুনছেন না।
বিশেষ করে সারের ডিলারশিপ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সংসদ সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন সংসদ সদস্য। এ বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সরকারের কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সেগুলো সংসদ নেতা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের অবহিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে তাদের এলাকার সমস্যা ও জনগণের প্রত্যাশার কথা শোনেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা
চিফ হুইপ জানান, বৈঠকে স্থানীয় সরকারবিষয়ক আলোচনা করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিচার ও আইনসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন আইনমন্ত্রী। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। এ ছাড়া শিক্ষা ও অন্যান্য খাতের বিষয়েও আলোচনা হয়।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সরকারের কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই প্রধানমন্ত্রী এ উদ্যোগ নিয়েছেন। সরকার যা করছে, তা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা সংসদ সদস্যদের পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে। কোথাও সমস্যা থাকলে তা সংসদ নেতা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের জানাতে হবে।
তিনি বলেন, সংসদ কীভাবে পরিচালিত হবে, সংসদে সদস্যদের ভূমিকা কী হবে এবং সংসদের বাইরে দলীয় কার্যক্রমে তাদের করণীয় কী—এসব বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তার ভাষায়, এটি ছিল ব্যতিক্রমী একটি সভা, যেখানে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি সংসদ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাদের মতামত শুনেছেন।
সংখ্যালঘুদের পাশে থাকার নির্দেশ
আসন্ন দুর্গাপূজায় হিন্দু সম্প্রদায়সহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়। কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায় যাতে সমস্যার মুখে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
চিফ হুইপ বলেন, পূজায় যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি বিএনপির নেতাকর্মী, সংসদ সদস্য ও দলীয় কর্মীদেরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিটি পূজামণ্ডপ ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে দাঁড়াতে দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।