জিনপিংয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক ২৬ জুন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে আজ রোববার দুপুরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী দুদিনের জন্য এ সফরে যাচ্ছেন। আগামীকাল ২২ জুন রাতে তিনি কুয়ালালামপুর থেকে চার দিনের সফরে চীনে যাবেন। আগামী ২৬ জুন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং প্রটোকল-সংক্রান্ত একটি নোট সই হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে আলোচনা হবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে।
গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এসব তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ২৩-২৬ জুন চীন সফর করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। তার আগে ২৫ জুন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক হবে তারেক রহমানের।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, মালয়েশিয়া সফর শেষে সেখান থেকে ২২ জুন বিকালে রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় ডালিয়ানে (চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী) পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন ২৩ জুন ডব্লিউইএফের প্রেসিডেন্ট ও সিইওর সঙ্গে তার বৈঠক করার কথা রয়েছে এবং সামার দাভোসে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দেশের সরকারপ্রধান; যেমনÑকাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে। সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আয়োজিত স্বাগত নৈশভোজে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
২৪ জুন সকালে তারেক রহমান সামার দাভোসের ১৩তম বার্ষিক সভার মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হলো ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’। ওইদিনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পর দুপুরে তিনি ট্রেনযোগে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। সেখানে তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন দিয়াও উথাই স্টেট গেস্ট হাউসে থাকবেন।
২৫ জুন সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের মিনিস্টার অব ইন্টারন্যাশনাল ডিপার্টমেন্ট অব সিপিসি সেন্ট্রাল কমিটি, বাণিজ্যমন্ত্রী, সিআইডিসিএর চেয়ারম্যান এবং এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম নামে একটি বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখবেন এবং চীনের ব্যবসায়ীদের সামনে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ ও সম্ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাবেন।
বিকালে চীনের গ্রেট হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। সেখানে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি এবং ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক আরো কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হবে।
বৈঠকের পর উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। এরপর তারেক রহমান তার সম্মানে চীনের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন।
পরদিন ২৬ জুন চেয়ারম্যান অব দ্য স্ট্যান্ডিং কমিটি অব ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (স্পিকার সমমর্যাদার পদ) প্রধান ঝাও লেজি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এরপর তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এর ফাঁকে একই দিন বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সেখানকার বীর যোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, ২৬ জুন বিকালে প্রধানমন্ত্রী বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন। বেইজিং সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর সংখ্যা এখন পর্যন্ত ২৮ জন ।
তারেক রহমানের চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, উজান থেকে আসা পানিপ্রবাহ ও সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশের একটি আলোচ্য বিষয় রয়েছে। তিনি বলেন, আমি ধারণা করছি সেই আলোচনা অনেক বিস্তৃত ও সম্প্রসারিত হবে। আপনারা যে প্রসঙ্গগুলো তুলেছেন, সেখানে তিস্তার আলোচনা হবে বলে আমরা ধারণা করছি। এ ছাড়া অন্যান্য নদীব্যবস্থাপনা বা ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হবে।
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র সচিব জানান, চীনের প্রেসিডেন্ট ঘোষিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, আমরা সফরের পর বলতে পারব যে, ঠিক কতটি উদ্যোগে আমরা যোগ দিচ্ছি বা দিচ্ছি না। তবে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি, এসব উদ্যোগকেই আমরা সাধুবাদ জানাই। বিশ্ব নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যে নতুন চিন্তাভাবনা, সেটিকে আমরা প্রশংসনীয় বলে মনে করি।
আসাদ আলম সিয়াম বলেন, এ সফর কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ, যা আমাদের দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান, তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আমরা আশা করি ।
বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ প্রশ্নে সচিব বলেন, এ ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। চীনের একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশে গড়ে তোলার কথা রয়েছে। সেটির কাজও হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে তাদের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হবে। আমরা বলেছি ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম হবে। সুতরাং নিশ্চয়ই আমরা চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে চাই।
কুয়ালালামপুরকে অনুরোধ করবে ঢাকা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে বাংলাদেশ থেকে আরো কর্মী নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব । সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে আসাদ আলম সিয়াম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে আমরা অবশ্যই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশ থেকে আরো কর্মী নেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ করব। তবে আপনারা যারা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার অনুসরণ করেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন মালয়েশিয়া সরকার বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশ নয়, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও বর্তমান প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনার মধ্যে নিয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি এই পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শেষ হলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে। আমাদের পক্ষ থেকে অবশ্যই তাদের এ বিষয়ে অনুরোধ জানানো হবে।
পররাষ্ট্র সচিব আরো জানান, মালয়েশিয়া ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম মুসলিম দেশ, যারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এ ছাড়া দেশটি সম্প্রতি আসিয়ানের চেয়ারম্যান ছিল এবং বাংলাদেশ আসিয়ানের ডায়ালগ পার্টনার হতে আগ্রহী। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী এবং আসিয়ান অঞ্চলে মালয়েশিয়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের একটি জোরালো সমর্থক। তাই এসব বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।