পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দুই দিনের সফরে আগামীকাল মঙ্গলবার দিল্লি যাচ্ছেন। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বেইজিং সফরের বিষয়টিও চূড়ান্ত হয়েছে। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর আমন্ত্রণে ড. খলিলুর রহমান বেইজিং সফরে যাবেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো আমার দেশকে নিশ্চিত করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বহুল আলোচিত দিল্লি সফরের ঠিক দুই দিন আগে চীন সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামীকাল দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুই দিনের সফরে দিল্লি পৌঁছাবেন। মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগদানের পথে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো মন্ত্রীর এটিই প্রথম দিল্লি সফর। এই সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদিপ সিং পুরির সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবেন বলে ঢাকা ও দিল্লির সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র আমার দেশকে জানিয়েছে, ভারতের আগ্রহেই মূলত এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই সফরকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে চরম অস্থিরতা বিরাজ করে। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে তৎপর হয়েছে দিল্লি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে ভারতীয় মিডিয়াগুলোয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিদিন সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। দেশটির প্রধান প্রধান গণমাধ্যম এই সফরকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করছে। টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ বেশ কিছু গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে। গণমাধ্যমগুলো বলছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ঠিকভাবে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারত সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহ দেখানোর পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে একধরনের দূরত্ব বজায় রেখেছে। এটা ভারতের জন্য একটি স্বস্তির জায়গা।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো আরো বলছে, আসন্ন সফরে নিরাপত্তা ইস্যুসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমার দেশকে বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে ভারতীয় মিডিয়াগুলো অতিরঞ্জিত খবর প্রচার করছে। ভারতীয় মিডিয়াগুলো প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে যে ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করছে, তা ঢাকার ওপর দিল্লির চাপ প্রয়োগের একধরনের কৌশল। কর্মকর্তারা বলেন, এই সফরের মাধ্যমে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কেোন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন একটি যাত্রা শুরু হতে পারে। তবে সফরের মূল অগ্রাধিকার হলো দুই দেশের মধ্যে স্থিতিশীল ও টেকসই সম্পর্ক গড়ে তোলা। আর এই সম্পর্কের জন্য ভারতের সঙ্গে ঝুলে থাকা বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলো সমাধানের পাশাপাশি বাংলাদেশের জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের ক্ষেত্রে দিল্লিকে অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে, গতকাল রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার আসন্ন চীন সফর নিয়ে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে চীন সফরের সম্মতি দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সফরের চূড়ান্ত তারিখ ও কর্মসূচির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হতে পারে।
গতকালের বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীনা রাষ্ট্রদূতকে তার চীন সফরের সম্মতির কথা জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে নির্বাচনে চীনের সমর্থন কামনা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বন্ধুপ্রত্রিম চীন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সভাপতি পদে বাংলাদেশকে সমর্থন জানানোর পাশাপাশি বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে বাংলাদেশকে সমর্থন জানাতে উৎসাহিত করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি মাসের ৩ তারিখ ঢাকা-বেইজিং পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত হয়েছে। পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকের পরবর্তী তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই বেইজিং সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে। ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে তৈরি হয় নতুন ভিত্তি। চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতি জোরালো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন জানানোর পাশাপাশি বন্দর ও পানি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয় চীন। অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে বেশ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় তখন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন বেইজিং সফরে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।