হোম > জাতীয়

বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা ফের যাচ্ছে সরকারের হাতে

সংসদ রিপোর্টার

বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা ফের যাচ্ছে সরকারের হাতে। গণভোট, দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশসহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ২০টি অধ্যাদেশ চলতি অধিবেশনে অনুমোদন পাচ্ছে না। এর মধ্যে বাতিল করা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা সম্পর্কিত তিনটি অধ্যাদেশ। এ তিনটি অধ্যাদেশের অধীনে গৃহীত কার্যক্রমে হেফাজতের কথা বলা হয়েছে। তবে গণভোটসহ ১৬টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে হেফাজতের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। অধ্যাদেশগুলো এখনই সংসদে বিল আকারে উত্থাপন না করে পরে যাচাই-বাছাই শেষে নতুন বিল উত্থাপনের কথা বলা হয়েছে। বাকি ১১৩টির মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপন এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল তোলার কথা বলা হয়েছে।

এসব বিষয়ে সুপারিশ করে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে সংসদে প্রতিবেদন উত্থাপন করেন। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এসব অধ্যাদেশ সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। পরে এগুলো যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য জাতীয় সংসদ সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে। ১৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির মধ্যে ১০ জন বিএনপির ও তিনজন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর। আরো একাধিক সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিবকমিটির আমন্ত্রণে বৈঠকে অংশ নেন।

ওই কমিটি তিনটি আনুষ্ঠানিক ও একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে। গতকালও একটি বৈঠক ডাকা হলে পরে তা বাতিল করা হয়। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টির বিষয়ে বিশেষ কমিটিতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য। অধ্যাদেশগুলো বাতিল ও এখনই পাসের সুপারিশ না করাসহ বিভিন্ন কারণে তারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।

সংবিধানে বলা আছে, কোনো অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন করা না হলে তার কার্যকারিতা লোপ পাবে। এর ফলে যে অধ্যাদেশ ২০টি বাতিল বা এখনই পাস হচ্ছে না, তার কার্যকারিতা আগামী ১০ এপ্রিলের পর লোপ পাবে। পাসের সুপারিশ করা ১১৩টি অধ্যাদেশ আগামী সোমবার থেকে পর্যায়ক্রমে তোলা হবে বলে সংসদে জানানো হয়। আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে বিলগুলো সংসদে পাস করতে হবে।

বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী যে ২০টি অধ্যাদেশ আগামী ১২ এপ্রিলের পর কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে তার বেশিরভাগই রাষ্ট্রীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে জারি করা হয়েছিল বলে অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি ছিল। ফলে এগুলো কার্যকারিতা হারালে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ এক ধরনের হোঁচট খাবে। পাশাপাশি সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে সংস্কার প্রশ্নে সামনের দিনে সংসদসহ রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হতে পারে।

এদিকে বিচারপ্রতি নিয়োগ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশসহ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন হুমকির মুখে ফেলবে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সচেতন মহল। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে করা এ অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা সংশোধনের প্রস্তাব জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী বলে তারা মতামত ব্যক্ত করেছেন।

যে চারটি রহিত করার সুপারিশ

বিশেষ কমিটির সুপারিশে বিচার বিভাগ সম্পর্কিত তিনটিসহ চারটি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে রহিতকরণ ও হেফাজত করতে বলা হয়েছে। এগুলো হলো : জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, ২০২৪; সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬। সংবিধানে বিচারক নিয়োগে আইন করার কথা থাকলেও এতদিন তা হয়নি। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো সু্প্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের লক্ষ্যে উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাইপূর্বক প্রধান বিচারপতি কর্তৃক রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ প্রদানের কথা বলা হয়। এতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে উল্লেখ করে বাতিলের সুপারিশ করা হয়। কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়- অধ্যাদেশ অনুয়ায়ী বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতির কার্যত কোনো ভূমিকা নেই। অ্যাপয়েনমেন্ট কাউন্সিলে সরকারের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম বলে কমিটি তার পর্যালোচনায় উল্লেখ করেছে।

বাতিলের সুপারিশ করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের বিষয়ে বিশেষ কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়- এটি বহাল থাকলে সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের কাজের কোনো সমন্বয় থাকবে না। প্রধান বিচারপতি নিম্ন আদালতের বিচারকদের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হবেন। একজন ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণ বিচারকদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অবশ্য আইনটির পর্যালোচনায় কিছু সংশোধনীসহ পাসের কথা বলা হয়। এতে বলা হয়েছিল, বিচারকদের আর্থিক স্বাধীনতা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ পাস করা যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত সুপারিশে বাতিল করার সুপারিশ করা হয়।

যে ১৬টি অধ্যাদেশের বিষয়ে ভবিষ্যতে নতুন বিল আনার সুপারিশ

বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়। যার মধ্যে ১১টিতে নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) দিয়েছে বিরোধী দল। এগুলো হচ্ছে—জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪; রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫; রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫; গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫; জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬; মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬; তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬।

এর মধ্যে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫; আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬; বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৬-এ বিরোধী দল আপত্তি দিয়েছে।

বিদ্যমান অধ্যাদেশ বাতিল করে ভবিষ্যতে নতুন করে তোলার সুপারিশকৃত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়ে কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়—মানবাধিকার কমিশনকে সরকারের কোনো বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হয়নি। এটা বড় ধরনের অসংগতি। গুমের মতো সংবেদনশীল অপরাধের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তাদের দায় সম্পৃক্ত রয়েছে। এ অধ্যাদেশের সঙ্গে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশের সঙ্গে সংযোগ থাকায় এতে সংশ্লিষ্টদের অধিকতর পরামর্শ প্রয়োজন।

গুমকে সংবেদনশীল অপরাধ উল্লেখ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের মতো গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশের পর্যালোচনায় একই ধরনের তথ্য উঠে আসে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারিকৃত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে গুমকে চলমান অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশে ট্রাইব্যুনালে পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া অভিযোগকারী বা ভুক্তভোগীকে ব্যক্তিগত আইনজীবী নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া আছে। গুমের শিকার ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশটি ল্যাপসের বিষয়ে সরকারের যুক্তি হচ্ছে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতি লাগবে। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটকের ক্ষেত্রে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিতে হবে। তবে বিরোধী দলের যুক্তি, গত ১৫ বছরে গুমের শিকার পরিবারগুলো সরকারের কাছে ন্যায়বিচার পায়নি। সরকারের কাছে অনুমতি চাইলে কখনো তা মেলে না।

ভবিষ্যতে সংশোধনের জন্য সুপারিশ করা এই ১৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট করার লক্ষ্যে গণভোট অধ্যাদেশও রয়েছে। ওই অধ্যাদেশের আলোকে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। চারটি শর্তের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। গণভোটে জয়ী হওয়ার প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী বিজয়ী সংসদ সদস্যদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ ও সংস্কার কমিশনের সভা অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও সরকারি দল শপথ নেয়নি। ওই পরিষদের বৈঠকও ডাকা হয়নি। গণভোট অধ্যাদেশ আইন আকারে পাস না হওয়ার প্রেক্ষাপটে ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

উল্লেখ্য, গণভোট অধ্যাদেশ বিষয়টি পর্যালোচনাকালে বিশেষ কমিটি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ-২০২৫ নিয়েও পর্যালোচনা করে। এতে বলা হয়, সাংবিধানিকভাবে অবৈধ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রণীত গণভোট অধ্যাদেশ একটি প্রশ্নবিদ্ধ অধ্যাদেশ। এ আদেশের মাধ্যমে সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে। বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থার পরিপন্থী। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশ সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বারিত উল্লেখ করে বলা হয়, স্পষ্টত যে, এ আইন সংবিধানের মূল কাঠামোকে পরিবর্তন করে ফেলেছে।

দুদকের তদন্ত ও গোপন অনুসন্ধানের ক্ষমতা বাড়িয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয় ২০২৫ সালে। এতে সরাসরি এজাহার দায়েরের বিধান, বিদেশে সংঘটিত অপরাধসসহ গুরুতর আর্থিক অপরাধকে আইনের আওতায় আনা এবং কমিশনের সদস্য বাড়ানো হয়। রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এতে বিদ্যমান কাঠামো পুনর্গঠন করে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম পৃথক করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠার বিধান করা হয়। এটি নিয়ে কর্মকর্তারা আন্দোলনে নেমেছিলেন। ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এটি করা হয়। এটি এখনো কার্যকর হয়নি।

সংশোধিত আকারে উত্থাপনের সুপারিশ

১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে কোথায় কী সংশোধনী আনা হবে, তা বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। এগুলো হলো—২০২৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ, কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট), জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধান) অধ্যাদেশ, ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ।

এর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ সংশোধন করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এ অধ্যাদেশে কোনো নির্দিষ্ট সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করা হয় এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ সত্তার মিছিল-মিটিং, প্রকাশনাসহ যেসব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা যাবে, তার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কমিটি সূত্রে জানা গেছে, অধ্যাদেশটি সংশোধন করে রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধের পাশাপাশি শাস্তির বিধান যুক্ত করা হচ্ছে।

৯৮টি হুবহু পাসের সুপারিশ

কমিটি ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু পাসের সুপারিশ করেছে। তার মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কিছু অধ্যাদেশ আছে। বিশেষ পরিস্থিতি ও জনস্বার্থে প্রশাসক নিয়োগের বিধান করা হয়। এক্ষেত্রে জামায়াতের আপত্তি আছে। এছাড়া আছে বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যামেন্ডমেন্ড অর্ডিন্যান্স ২০২৪, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতির পিতার পরিবার-সদসদ্যদের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, বিশ্ববিদ্যালয়সংক্রান্ত কতিপয় আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ (বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যায়ের আইনে উল্লিখিত বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা, শেখ হাসিনা ইত্যাদি নামের পরিবর্তন)। গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট), জাতীয় সংসদের সীমানা নির্ধারণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ। অনেকগুলো আইন আছে যেগুলো নাম পরিবর্তনসংক্রান্ত।

বিরোধী দলের নোট অব ডিসেন্ট

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল করার প্রস্তাব করেছে সরকার। এর সঙ্গে ভিন্নমত দিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বলেছে, অধ্যাদেশটি বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ অধ্যাদেশের অধীন প্রধান বিচারপতিকে প্রশাসনিক প্রধান করে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ নামে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠন করা হয়েছে, যা বিচার বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। এ সচিবালয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো, বিচার প্রশাসন পরিচালনায় সুপ্রিম কোর্টকে কার্যকর সহায়তা প্রদান করা। এর আওতায় অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব এ সচিবালয় পালন করবে। স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

এছাড়া অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা, ছুটিসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এ সচিবালয়ের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। এর ফলে নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে বিচারকদের ওপর যে নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তার করা হতো, তার অবসান ঘটবে। বিচারকরা আরো স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন, যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অধ্যাদেশটি অপরিবর্তিত অবস্থায় পাস করার পক্ষে অবস্থান নেয়।

সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করার প্রস্তাব করা হয়। তবে তাতে ভিন্নমত প্রকাশ করে জামায়াতের সদস্যরা বলেন, কমিশনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, তদন্ত প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিতের লক্ষ্যে বেশকিছু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুদকের তদন্ত ও গোপন অনুসন্ধান ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত করা হয়েছে। সরাসরি এজহার দায়েরের নুতন বিধান যোগ করা হয়েছে। বিদেশে সংঘটিত অপরাধসহ গুরুতর আর্থিক অপরাধকে আইনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। কমিশনের কাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে বাছাই কমিটিকে বর্ধিত করা হয়েছে এবং কমিশনের সদস্য সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশ দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে আরো কার্যকর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে দেশের স্বার্থে দুর্নীতি রোধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তারা অধ্যাদেশটি অপরিবর্তিত অবস্থায় পাসের পক্ষে অবস্থান নেন বলে জানান বিরোধী দলের সদস্যরা।

আইনজীবীদের উদ্বেগ

বিচারপ্রতি নিয়োগ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশসহ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন হুমকির মুখে ফেলবে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সচেতন মহল। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে করা এ অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা সংশোধনের প্রস্তাব জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী বলে তারা মতামত ব্যক্ত করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা মেজর সংশোধনের মাধ্যমে বিএনপি মূলত দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করল। জুলাই গণআন্দোলনের মাধ্যমে দেশকে পরিবর্তনের যে বিশাল জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সে পথ হতে বিএনপি নিজেকে সরিয়ে নিল। আমি মনে করি, এর মাধ্যমে মূলত দেশে নতুন ফ্যাসিবাদ কায়েমের পথ প্রশস্ত হবে। এ সিদ্ধান্তগুলো বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বতন্ত্রীকরণের প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করবে।

অন্যদিকে আদালতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানান, সরকারের এ উদ্যোগের ফলে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার যে আশা সঞ্চার হয়েছিল তা মারাত্মকভাবে খর্ব হবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল হলে নিম্ন আদালতের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়বে, যা বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার জন্য বড় বাধা। এছাড়া বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে পুনরায় বিচারক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব ও অকার্যকর প্রক্রিয়া ফিরে আসবে বলে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

অন্তর্বর্তী সরকার যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল, তা থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখছেন বলে তারা জানান। এ উদ্যোগকে তারা ‘জুলাইয়ের সঙ্গে গাদ্দারি’ এবং জনগণের ম্যান্ডেটের অবমাননা হিসেবে আখ্যা দেন।

ইয়াং জাজেস ফর জুডিশিয়াল রিফর্মসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে জানিয়েছে যে, রাষ্ট্র সংস্কারে সরকারি দল বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার ৯ নম্বর দফায় স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার ছিল, মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের কর্তৃত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা হবে এবং বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক সচিবালয় থাকবে। পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সাংবিধানিক সংস্কার অংশের ২০ নম্বর দফায় অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করতে সংবিধান সংশোধনের অঙ্গীকার রয়েছে এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ অংশে পৃথক সচিবালয়কে আরো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মূল স্পিরিট ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। জুলাই জাতীয় সনদেও দেশের সব প্রধান রাজনৈতিক দল স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হয়েছিল। তাই জাতীয় ঐকমত্যকে সম্মান জানানোই নির্বাচিত সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন ‘ইয়াং জাজেস ফর জুডিশিয়াল রিফর্ম’সহ আদালত সংশ্লিষ্ট সংগঠন নেতৃবৃন্দ।

বিল্ডিং কোড মানতে টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

শান্তিরক্ষায় অবদানের জন্য জর্জিয়া অঙ্গরাজ্য হতে সম্মাননা পেল বাংলাদেশ

আরো ১৭ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত

সরকারি-বেসরকারি অফিসের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ

অবৈধভাবে পাচারকালে ৪৯৫ বস্তা সিমেন্টসহ ট্রলার জব্দ

৬ কোটি ৬২ লাখ টাকার ডায়মন্ড ও বিদেশি মুদ্রাসহ ভারতীয় নাগরিক আটক

ডেপুটি স্পিকারকে প্রধান করে সংসদের লাইব্রেরি কমিটি গঠন

হামের প্রাদুর্ভাব: ১৮ দিনে হাসপাতালে ৩৭০৯ শিশু, মৃত্যু ১৩

সব অধ্যাদেশ ছাপাতে কত খরচ, সংসদে জানালেন আইনমন্ত্রী

ইলিয়াস আলীর ‘হত্যাকাণ্ড’ আনপানিস্টড যাবে না: স্পিকার