প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে প্রতি বছর অন্তত একটি করে গাছের চারা রোপণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে এবং পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনুষ্ঠানস্থলে আসার আগে আমি বাইরে একটি বৃক্ষরোপণ করেছি। আমার সঙ্গে সারা বাংলাদেশে অনলাইনে ২৯ হাজার ৬শ বিভিন্ন স্থানে সংযুক্ত ছিল। প্রত্যেক জায়গায় আজকে তিনটি করে গাছ লাগানো হয়েছে। সব মিলিয়ে একদিনে প্রায় ৯০ হাজার গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকার তোমাদের জন্য এমন সুযোগ-সুবিধা তৈরি করবে যাতে তোমরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠতে পারো। তোমরা আত্মবিশ্বাসী থাকলে আমিও আত্মবিশ্বাসী হবো। তার বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে একটি জিনিস চাই—প্রতি বছর প্রত্যেকে একটি করে গাছ রোপণ করবে।
তিনি বলেন, “তুমি যেখানে থাকো, যেখানে খেলাধুলা করো, যে স্কুলে বা কলেজে পড়ো—সেখানকার কোনো এক জায়গায় প্রতি বছর অন্তত একটি করে গাছ লাগাবে।” এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চান তারা এ কাজ করতে পারবে কি না। গ্যালারিতে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ বলে সাড়া দেয়।
বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদেশে আমাদের সবাইকে থাকতে হবে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নানা কারণে অনেক গাছ কেটে ফেলতে হয়েছে। ফলে বাতাস দূষিত হয়ে গেছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে একসময় বিশুদ্ধ বাতাস গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, তুমি নিজের জন্য একটি গাছ লাগাবে। তুমি যেমন বড় হবে, গাছটাও তেমন বড় হবে। একসময় দেখবে গাছটাই তোমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে।
গাছের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি ঢাকায় যেখানে থাকি, সেখানে বড় বড় গাছ আছে। লন্ডনে যে বাসায় থাকতাম, সেখানেও অনেক বড় গাছ ছিল। আমি অনেক সময় গাছের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করি, পরিকল্পনা করি। গাছের দিকে তাকিয়ে থেকে আমি অনেক কিছু ভাবি। এটা আমার একটি গোপন কথা।”
তিনি আরও বলেন, “যখন বাতাসে গাছ দুলতে থাকে, তখন দেখতে খুব সুন্দর লাগে। আমার বিশ্বাস, তোমরা যখন একটি গাছ লাগিয়ে সেটিকে বড় হতে দেখবে, তখন তোমরাও একই অনুভূতি পাবে।”
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রকল্পের জন্য ‘উদ্ভাবনী মেধাবী পুরস্কার’ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— ঢাকার সেন্ট জোসেফ উচ্চ বিদ্যালয়, মেহেরপুরের সন্ধানী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দিনাজপুর সরকারি কলেজ, দিনাজপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, নীলফামারীর শরীফাবাদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, চট্টগ্রামের ফুলকি সহজপাঠ বিদ্যালয়, কুষ্টিয়া জেলা স্কুল, নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পটুয়াখালীর গলাচিপা আলিম মাদ্রাসা। প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সেন্ট জোসেফ উচ্চবিদ্যালয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও ডা. জুবাইদা রহমানকে স্মারক ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে
প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “সবার আগে বাংলাদেশ। তোমাদের মতো তরুণ প্রজন্ম যেই দেশে আছে, সেই দেশকে নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। তবে দরকার শৃঙ্খলা।”
তিনি বলেন, “আমরা যখন বিদেশের বিভিন্ন শহর দেখি, তখন সেগুলোকে খুব পরিচ্ছন্ন দেখতে পাই। কিন্তু আমাদের অনেক রাস্তাঘাট এখনো নোংরা। বাইরে থেকে কেউ এসে ময়লা করছে না, আমরা নিজেরাই করছি।”
তিনি প্রশ্ন রাখেন, “আমরা কি সবাই মিলে আমাদের দেশটাকে পরিষ্কার রাখতে পারি না?” শিক্ষার্থীরা ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের আশপাশে কেউ যদি কোনো পাবলিক প্লেসে ময়লা ফেলে, আমরা তাকে বলব এটি অন্যায়। তাকে সচেতন করব যে, জনসমাগমস্থলে ময়লা ফেলা উচিত নয়।”
তিনি বলেন, “আমরা সবাই একটি সুন্দর বাংলাদেশ চাই। কিন্তু চেষ্টা না করলে বাংলাদেশ সুন্দর হবে কীভাবে?”
তরুণদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের সময় প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার বয়স ৬০ বছর হয়ে গেছে। এখন সময় তোমাদের। ভবিষ্যৎ তোমাদের। দেশ গড়ে তুলতে হবে তোমাদেরই।”
তিনি বলেন, “শুধু সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না। যেমন একটি ঘর পরিষ্কার রাখতে পরিবারের সবাইকে দায়িত্ব নিতে হয়, তেমনি দেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা যদি পরিবেশ ঠিক রাখি, গাছের সংখ্যা বাড়াই এবং নিজের এলাকাকে নিজের ঘরের মতো পরিচ্ছন্ন রাখি, তাহলে পুরো পরিবেশ সতেজ হবে। সেই সুন্দর পরিবেশে বসে তোমরা নতুন নতুন উদ্ভাবন, গবেষণা ও পরিকল্পনা করতে পারবে, যা দেশের মানুষের উপকারে আসবে।”
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্টার্টআপ উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর পর বিএনসিসির একটি চৌকস দল প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। পরে তিনি গার্ড পরিদর্শন করেন এবং সদস্যদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং জাতীয় স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী আইডিয়া প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে তিনি দেশের তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পরে তিনি সম্মেলনের মূল অধিবেশনে যোগ দেন।
এএস