যাকাত ফেয়ারে বক্তারা
দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে এখনো প্রায় চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এর অন্যতম কারণ চরম আর্থিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। অনেক সামর্থ্যবান ব্যক্তি যাকাত দেন না, আবার অনেকে দিলেও তা সঠিকভাবে হিসাব করে বা যথাযথ খাতে দেন না। ব্যক্তিগতভাবে যাকাত আদায়ের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আদায় ও বিতরণ করা হলে এর উপকারিতা অনেক বেশি। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি কার্যকর যাকাত ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে আর্থিক বৈষম্য হ্রাস করা সম্ভব।
শনিবার রাজধানীর বেইলি রোডে অবস্থিত অফিসার্স ক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘চতুর্দশ যাকাত ফেয়ার-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। এতে সভাপতিত্ব করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টের (সিজেডএম) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া।
বক্তারা বলেন, যাকাত শুধু একটি আর্থিক বিধান নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও। যাকাত দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে করা সম্ভব।
ধর্ম উপদেষ্টা খালিদ হোসেন বলেন, যাকাতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ইসলামের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে যাকাত রাষ্ট্রীয়ভাবে আদায় করা হত। ব্রিটিশ ও মুঘল আমলে এটি ব্যক্তি পর্যায়ে নেমে আসে। ফলে যাকাতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়।
তিনি বলেন, সঠিকভাবে হিসাব করে যাকাত আহরণ ও বিতরণ করা গেলে বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা যাকাত সংগ্রহ করা সম্ভব। এই অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা গেলে দারিদ্র্য বিমোচনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অভাব ও ক্ষুধার কারণে মানুষ অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত কাজে জড়িয়ে পড়ে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে অনেক মানুষ অনৈতিক পেশা থেকে মুক্তি পেতে পারে, যা যাকাতের মাধ্যমেই সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা যাকাত দেন না, তাদের ঈমান প্রশ্নবিদ্ধ। যাকাত কোনো দান-দক্ষিণা নয়; এটি গরিবের অধিকার। অথচ সমাজে বিষয়টি অবহেলিত। তাই যাকাত বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। সরকারিভাবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে একটি যাকাত বোর্ড থাকলেও সেখান থেকে বছরে প্রায় ১১ কোটি টাকা সংগ্রহ হয়, যা সম্ভাবনার তুলনায় খুবই কম।
সভাপতির বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্ব এক গভীর দার্শনিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটের তিনটি দিক রয়েছে—গন্তব্য, গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ এবং ব্যবহৃত উপকরণ বা ইনস্ট্রুমেন্ট। জাতিসংঘও এই গন্তব্য নিয়ে গভীর সংকটে আছে।
তিনি বলেন, সিজেডএমের উদ্যোগের একটি বৈশ্বিক গুরুত্ব রয়েছে। যাকাতের আর্থিক দিকের পাশাপাশি এর নৈতিক দিকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যাকাত দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়; এই অর্থ কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা তদারকি করাও দায়িত্বের অংশ। মানুষকে যাকাত দিতে উদ্বুদ্ধ করা এবং জীবিকাভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বলেন, ৯২ শতাংশ মুসলমানের এই দেশে অনেকে যাকাত দিলেও অনেকেই বিষয়টির গুরুত্ব দেন না। আবার যারা দেন, তাদের অনেকেই যাকাতের সঠিক নিয়ম সম্পর্কে অবগত নন। যাকাত ফেয়ারের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। রাষ্ট্রীয় ট্যাক্স ফাইল সংরক্ষণে আমরা যতটা গুরুত্ব দিই, যাকাত তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, যাকাত দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবকল্যাণের জন্য একটি শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলাদেশে যাকাতের মাধ্যমে কার্যকর দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব—সিজেডএমের কার্যক্রম তার ইতিবাচক উদাহরণ। ব্যক্তিগতভাবে যাকাত দেওয়ার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেওয়া অনেক বেশি ফলপ্রসূ।
অনুষ্ঠান শেষে যাকাত ফেয়ারে ‘ইসলামিক সামাজিক অর্থায়ন: ভবিষ্যৎ পথনির্দেশিকা’ শীর্ষক একটি সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের অধ্যাপক কবির হাসান, যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির ম্যাক্রোইকোনমিক্সের সহযোগী অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক এবং মালয়েশিয়ার ইনসেইফ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. জিয়ান আহমদ।
প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে যাকাত ও ওয়াকফ থেকে আয় জিডিপির প্রায় দেড় শতাংশ থেকে চার শতাংশ হতে পারে, যা টাকার অঙ্কে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি। যেখানে দেশের মোট রাজস্ব জিডিপির আট থেকে ৯ শতাংশ, সেখানে শুধু যাকাত ও ওয়াকফ দিয়েই একটি বড় অংশ কাভার করা সম্ভব। এজন্য একটি ‘ইসলামিক সোশ্যাল ফাইন্যান্স মিনিস্ট্রি’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদের সভাপতিত্বে এ সিম্পোজিয়ামে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ইউসুফ মাহবুবুল ইসলাম, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ এ সোবহানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম।
সভাপতির বক্তব্যে ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, যাকাত আদায় ও বিতরণে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। অর্থনীতিতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। সরকার যদি সঠিক গাইডলাইন ও অনুপ্রেরণা দেয়, তাহলে যাকাত ব্যবস্থাকে কার্যকর ও স্বচ্ছ করা সম্ভব।
এবারের ফেয়ারে ছিল- বিভিন্ন যাকাত ও দাতব্য সংস্থা, ইসলামি সোশ্যাল ফাইন্যান্স ও বিভিন্ন প্রকাশনীর ২৫টি স্টল। সিজেডএমের উদ্যোগে গত বছর ৫০০ দরিদ্র ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষা বৃত্তি দেওয়া হয়েছে। এ অনুষ্ঠানে মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল আমার দেশ, যমুনা টেলিভিশন এবং দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস।