মানবতাবিরোধী অপরাধ
ভারতে পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম-খুন-অপহরণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিচার প্রক্রিয়া এখন চলমান। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অভিযুক্ত সেনাকর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এতে ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে বিচার বানচালসহ নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিচারকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগীদের অনেকেই হয়রানির আতঙ্কে রয়েছেন।
সেনা অফিসারদের বিচার কোন প্রক্রিয়ায় হবে এ নিয়ে নানা বিতর্কের পর ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী মামলায় সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচার শুরু হওয়াকে ন্যায়বিচারের পথে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এ ব্যাপারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু বিচারের শুরু থেকেই সামরিক অফিসারদের মাঝে বিভক্তি ছড়ানো, ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার ও শেষাবধি তাদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণার অভিযোগ আসছে। এ প্রোপাগান্ডায় ভারতপন্থি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে নানা অপতথ্য।
বিচারের সূচনা ও অগ্রগতি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক ও বর্তমান সেনাকর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগের সময় সংগঠিত বিভিন্ন গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, অপহরণ ও বেআইনিভাবে র্যাবের টিএফআই ও জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল বা জেআইসিতে আটক করে ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগসহ পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়। নানা জল্পনা-কল্পনার পর গত বছরের ২২ অক্টোবর আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল-১ এ ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে হাজির করা হয়।
এদিন অভিযুক্ত সেনা অফিসারদের বিশেষায়িত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে করে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। তার আগে ৮ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। সেদিন দুটি গুমসহ তিনটি মামলায় দাখিলকৃত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। গুম সংক্রান্ত টিএফআই ও জেআইসি’র দুটি মামলা হচ্ছে বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম-নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায়। অন্যটি হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায়।
গুমের মামলাগুলোর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী আমার দেশকে জানান, ডিজিএফআই সংক্রান্ত মামলাটিতে এ পর্যন্ত বিএনপি নেতা ও গুমের শিকার হুম্মাম কাদের চৌধুরী, লে. কর্নেল হাসিনুর রহমান, গুমের শিকার দুজন ব্যবসায়ীসহ পাঁচজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। টিএফআই সংক্রান্ত মামলাটিতে এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন আট বছর ধরে গুমের শিকার ও বর্তমান সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমান, মাসরুর আনোয়ার, সফিকুল ইসলামসহ চারজন। মামলাগুলোতে আরো কয়েক ডজন গুমের শিকার ও সংশ্লিষ্টের সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
অপপ্রচার ও ইন্ডিয়া ফ্যাক্টর
ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, আসামিপক্ষ নানাভাবে মামলা কার্যক্রমে ধীরগতি ও জটিলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে শুরু থেকেই। বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানাভাবে ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় নানা ডকুমেন্টস চাওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সামরিক অফিসারদের বিচার নিয়ে চিহ্নিত ভারতপন্থি মিডিয়া ও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ভিত্তিহীন ও মনগড়া খবর প্রচার করার অভিযোগ আসছে। যাতে বলা হচ্ছে, এসব সামরিক অফিসার পুরোপুরি নির্দোষ ও ঘটনার শিকার। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে এ সংক্রান্ত মামলায় সাক্ষীদের সম্পর্কেও নানা ধরনের অপতথ্য ছড়িয়ে তাদের বিতর্কিত করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ ও দোসররা অর্থায়ন করছে মর্মে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে প্রকাশিত ইংরেজি মিডিয়া নর্থ-ইস্ট নিউজ তাদের বেশ কয়েকটি রিপোর্টে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সামরিক অফিসারদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে শতাধিক গুম-খুনে জড়িত সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বোন ও তারই আইনজীবী নাজনীন নাহারকে হাইলাইটস করা হয়। এ বছর ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত নিউজে গুমের মামলাগুলোর অন্যতম সাক্ষী লে. কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমানকে ভারতীয় স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী উলফার অস্ত্রের প্রশিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই নিউজ সাইটটি পরদিন ১৫ এপ্রিল শতাধিক গুম খুনে অভিযুক্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে নির্দোষ প্রমাণে তাকে ‘ঘটনার শিকার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই প্রোপাগান্ডা গ্রুপের আরেক অংশ হিসেবে ইউটিউবার কাজী রুনা তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চ্যানেলে সামরিক অফিসারদের বিচারে সাজানো সাক্ষী হাজির করা, জেরায় তাদের তথ্যের গরমিলসহ নানা বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা করে কৌশলে সামরিক অফিসারদের নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। এভাবে বিভিন্ন ধরনের সাইট ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত গুম-খুনের এসব মামলাকে দুর্বল করার চেষ্টা করার অভিযোগ উঠছে।
ষড়যন্ত্র ও চ্যালেঞ্জ
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) কেন্দ্রে গুম ও নির্যাতনের শিকার হুম্মাম কাদের চৌধুরী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গত ১৯ জানুয়ারি সাক্ষ্য দেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ এ তার জবানবন্দিতে তিনি নিজের গুম হওয়ার ঘটনা, আটক অবস্থায় দীর্ঘদিনের নির্যাতন এবং জেআইসি সেলে কাটানো অভিজ্ঞতার বিস্তারিত তুলে ধরেন। জবানবন্দিতে তিনি জেআইসির এ মামলায় অভিযুক্ত আসামি সামরিক কর্মকর্তাদের দ্রুত বিচার দাবি করেন।
ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল বা জেআইসিতে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অন্যতম সাক্ষী ও গুমের শিকার সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান আমার দেশকে বলেন, আসামিপক্ষ ক্রমাগত বিচার বিলম্বিত করার চেষ্টা করছে। তবে সবচেয়ে যেটি আমি আশঙ্কা করছি সেটি হলো, এসব গুম-খুনের নেপথ্যের নায়করা যেন বিচারের আওতা থেকে বেরিয়ে না যায়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সত্যকে স্বীকার করা, যাতে বাংলাদেশে আর গুম সংস্কৃতি ফিরে না আসতে পারে।
আমার দেশ-এর সঙ্গে কথা হয় ২০১৯ সালের ১৯ জুন গাজীপুর এলাকা থেকে গুমের শিকার ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী নাসরিন জাহান স্মৃতির। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিগত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পটপরিবর্তনের পর তিনি তার স্বামীর গুমের অভিযোগ করেন। র্যাব হেড কোয়াটারে কর্মরত সিগনার অফিসার রাসেল আহমেদ কবির, কায়সার এ হাবিবসহ ৯ জনকে অভিযুক্ত করে এ অভিযোগ করেন। নাসরিন জাহান স্মৃতি জানান, এত মাস হয়ে গেল কিন্তু অভিযুক্ত র্যাব সদস্যদের কিছুই হয়নি। আমরা কোনো বিচার পাব বলে মনে হচ্ছে না। আমরা হতাশ। এটি যদি র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ না হতো তাহলে হয়তো মামলা এগুতো। এখন উল্টো আমরা ভয়ে রয়েছি। কারণ র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে আমরাই আবার গুমের শিকার হয়ে যাই কি না, সেই আতঙ্কে রয়েছি।
গুম সংক্রান্ত গঠিত বিএনপির গঠিত কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম জাহিদ বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময় সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের গুমের ঘটনাগুলোর অভিযোগের একটি তালিকা আমরা দিয়েছিলাম। এর আসামিদের তালিকায় ছিল র্যাব, আয়নাঘরে গুমে থাকা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু এগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়ায় এখনো পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা সন্তুষ্ট নয়।
২০১৬ সালের ২৫ জুন খুলনা শহরের পাওয়ার হাউজ এলাকা হতে র্যাব পরিচয়ে উঠিয়ে নেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান সিফাতকে। তার ভাই মাহফুজ আমার দেশকে বলেন, আমার মেধাবী নিরপরাধ ভাইকে ১৭ দিন গুম রেখে বিভিন্ন কথিত জঙ্গি মামলায় ৪৩ দিন রিমান্ড রেখে নির্দয়ভাবে মেরে ফেলা হয়। ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন সংস্থায় আমরা অভিযোগ দায়ের করলেও রাষ্ট্র র্যাব সদস্যসহ অভিযুক্তদের কিছুই করেনি। আমরা পুরোপুরি হতাশ। আমাদের আশঙ্কা সেনা অফিসার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা জড়িত থাকায় এ বিচারটি এগোয়নি।
র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অন্যতম সাক্ষী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, গ্রেপ্তারকৃত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এভাবেই ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃত অফিসাররা ছিলেন হুকুমের গোলাম, তারা নির্দোষ- এভাবে মূল অভিযুক্তদের দোষ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করা হচ্ছে। আমাদের বুঝতে হবে এসব অভিযুক্ত এবং নেপথ্যের কুশীলবদের কাছে প্রচুর লুটপাটের অবৈধ অর্থ রয়েছে। তাই তারা বিভিন্নভাবে এ বিচারের ফোকাস থেকে জাতিকে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টায় আছে।
অভিযুক্ত সামরিক অফিসারদের বিচার নিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বলে আমার দেশকে জানান বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা চিরাচরিতভাবে তাদের মক্কেলের মামলা দেরি করতে চেষ্টা করতেই পারে। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন। মামলাগুলোতে অনেক আসামি হওয়ায় তাদের জেরায় প্রচুর সময় যাচ্ছে। মামলাগুলোর অগ্রগতিতে কোনো ধরনের বাধা বা চাপ রয়েছে কি নাÑ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার বা অন্য কোথাও থেকে এ বিষয়ে কোনো বাধা নেই। তিনি এ সংক্রান্ত মামলাগুলোর অগ্রগতিতে আরো কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় সে সম্পর্কে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
উল্লেখ্য, টিএফআই সংক্রান্ত মামলায় মোট আসামি ১৭ জন, তাদের মধ্যে ১০ জন অফিসার কাস্টডিতে রয়েছেন। আর ডিজিএফএর মামলায় মোট ১৩ জন আসামির তিনজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ মামলাগুলোর প্রধান আসামির তালিকায় আরো রয়েছেন পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকী প্রমুখ।