কৃষিখাতের উন্নয়ন, বাজারব্যবস্থার শৃঙ্খলা কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার—সব ক্ষেত্রেই কৃষককে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে নীতি ও প্রযুক্তি নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বাজার নিরাপত্তা, ন্যায্যমূল্য এবং ন্যায্য মুনাফা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত ‘কৃষি ইকোসিস্টেম বা পরিবেশের সর্বোচ্চ প্রসার/উন্নয়ন: ব্লকচেইনের মাধ্যমে সংযোজন, অর্থায়ন এবং সহজীকরণ/গতিশীলকরণ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, আধুনিক কৃষিব্যবসার সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগী ও অংশীজনের সমস্যা নিয়ে যেভাবে আলোচনা হয়, মূল উৎপাদক কৃষকের সমস্যা নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয় না। অথচ কৃষিখাতের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে কৃষকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, “প্রযুক্তির যত অগ্রগতিই হোক না কেন, মানুষের খাদ্যগ্রহণের জৈবিক অনিবার্যতার কারণে কৃষির ওপর আমাদের নির্ভর করতেই হবে। আমাদের দেশের প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ শতাংশ মানুষ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ সমাজে কৃষি পেশাকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে অবহেলার চোখে দেখা হয়। কৃষি ও কৃষকের এই স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত মূল্য না দিলে কোনো আলোচনাই পূর্ণাঙ্গ হবে না।”
কৃষিবান্ধব সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কৃষি ও কৃষককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তনসহ কৃষকদের সহায়তায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। দেশের অর্থনীতি ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে কৃষি সবচেয়ে কৌশলগত খাতগুলোর একটি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কৃষিখাতের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা যেন প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের উৎপাদন, বাজারের নিরাপত্তা, ন্যায্য মুনাফা এবং পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কৃষক যাতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতারিত না হন, সে জন্য কার্যকর ও কাঠামোগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকা প্রয়োজন। কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেলে কৃষির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। তাই প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং কৃষকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বিশ্বব্যাপী কৃষিখাতে ভর্তুকিনির্ভরতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে জহির উদ্দিন স্বপন এ খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও লাভজনক সমাধান খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার কৃষিকে আরও শক্তিশালী ও লাভজনক করে তুলতে পারে।
সেমিনারে বক্তারা কৃষিখাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আধুনিক ব্লকচেইন প্রযুক্তির সঙ্গে কৃষিব্যবস্থার সংযোগ স্থাপনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁরা কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, বাজারসংযোগ বৃদ্ধি এবং অর্থায়ন প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে কৃষি ইকোসিস্টেমকে আরও গতিশীল করার প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (আইএফএডি) কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. ভ্যালেন্টাইন আচানচো, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ জিয়াওকুন শি, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশনের (গেইন) কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. রুদাবা খন্দকার এবং ইনোভেটেক প্যানেল-১ (বাজার সংযোগ) প্রকল্প পরিচালক মিস ক্রিস্টিনা ওলসেন।
এ ছাড়া সেমিনারে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. শাইফুর রহমান মজুমদার, জেনারেল ম্যানেজার শাহজাহান শেখ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবি) কান্ট্রি হাব ম্যানেজার আলী এম. খান এবং ব্যাংক এশিয়ার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জিয়াউল হাসান মোল্লাসহ অন্যান্য অতিথি।
সেমিনারে কৃষিখাতের উন্নয়নে কৃষকের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া, প্রযুক্তির সুবিধা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া, কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আধুনিক অর্থায়ন ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে একটি টেকসই কৃষি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।