বিদ্যুৎ খাত নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটি তাদের চুড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ এর আওতায় শেখ হাসিনার সরকার ১৫৬টি চুক্তি করেছিল। এসব চুক্তির বিষয়ে কমিটির কী সুপারিশ এ বিষয়ে কমিটি কিংবা সরকারের পক্ষে কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় কমিটি মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাউজুল কবির খানের হাতে প্রতিবেদন তুলে দেন। এসময় মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পর্যালোচনা ও সুপারিশ সম্পর্কে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, আমরা প্রতিবেদন পেশ করেছি। এটি প্রকাশ করা কিংবা না করার পূর্ণ এখতিয়ার সরকারের। আমরা আশা করছি সরকার জাতীয় স্বার্থে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, আদানি গ্রুপসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য সরকার ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করে দেয়। এ কমিটিতে বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট আলী আশফাক, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মোশতাক খানকে সদস্য করা হয়। কমিটিকে যে কোনো সূত্র থেকে তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় যে কোনো নথি নিরীক্ষা করা, সংশ্লিষ্ট যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে শুনানিতে তলব এবং বিশেষ আইন (ইনডেমনিটি) আইনের আওতায় করা চুক্তিগুলোয় দেশের স্বার্থরক্ষা হয়েছে কি না, তা নিরীক্ষা করার পূর্ণ এখতিয়ার দেওয়া হয়।
এছাড়াও সরকার ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরে স্বেতপত্র প্রকাশ করতে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছিল। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন কমিটির প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে এ দুই খাতে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়, যা দিয়ে চারটি পদ্মা সেতু তৈরি করা যেত। এ দুর্নীতি মূলত হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কমিশন এবং কেন্দ্র ভাড়া ও অতিরিক্ত মুনাফা-এ তিন খাতে।
দুর্নীতির পরিসংখ্যান চিত্র তুলে ধরে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আমার দেশকে বলেন, বিদ্যুৎ খাতে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে মোট খরচ করা হয় দুই হাজার ৮৩০ কোটি ডলার। বর্তমান বিনিময়হারে প্রায় তিন লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। ক্যাপাসিটি চার্জে লুটপাট করা হয় এক লাখ কোটি টাকার বেশি।
তিনি বলেন, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে লুট করা হয় এক হাজার ৫০৭ কোটি টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আট হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে লুটপাট করা হয় ১৭ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা। এর অর্থ বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চলেনি এবং এ টাকা তাদের বসিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে।
ক্যাপাসিটি চার্জের নামে অর্থ লুটের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, সামিট গ্রুপ নিয়েছে ১০ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা, অ্যাগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল নিয়েছে সাত হাজার ৯৩২ কোটি টাকা, আল্ট্রা পাওয়ার হোল্ডিংস নিয়েছে সাত হাজার ৫২৩ কোটি টাকা, ইউনাইটেড গ্রুপ নিয়েছে ছয় হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা এবং আরপিসিএল নিয়েছে পাঁচ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। শেখ হাসিনার সরকার ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির নামে ৯ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়েছে ১১ হাজার ১৫ কোটি টাকা।