রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ওপর সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা আরোপ করাকে সংবিধান লঙ্ঘন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা বলে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।
সোমবার রাজধানীর তোপখানা রোডস্থ দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন : ৭০ অনুচ্ছেদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই মতামত ব্যক্ত করেন।
আলোচনা সভায় গীতিকবি ও রাষ্ট্রচিন্তক শহীদুল্লাহ ফরায়জী তার মূল প্রবন্ধে বলেন, সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হলেও এটি সংসদের কোনো অধিবেশন বা সংসদীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র নির্বাচন। সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নের সময় সংসদীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় তারা সংবিধান নির্ধারিত ‘নির্বাচকমণ্ডলীর’ সদস্য হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রদত্ত ভোট সাংবিধানিক অর্থে সংসদে প্রদত্ত ভোট নয় এবং এখানে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করার কোনো সুযোগ নেই।
সরকারের চিফ হুইপের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, চিফ হুইপ কর্তৃক ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে আসন শূন্য হবে’—এমন বক্তব্য ৭০ অনুচ্ছেদের আক্ষরিক অর্থ এবং সংবিধানের ৪৮(১), ১১৯ অনুচ্ছেদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর সমন্বিত কাঠামোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম তার বক্তব্যে বলেন, আমরা যে রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলছি এবং বিএনপিও যে সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছিল—তার একটি প্রধান লক্ষ্য ছিল ৭০ অনুচ্ছেদের দৌরাত্ম্য কমানো। কিন্তু এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এমপিদের ওপর ৭০ অনুচ্ছেদের জুজু দেখিয়ে ভয় ছড়ানো হচ্ছে, যা গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এক বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।
বিশেষ বক্তা রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবি আমাতুল্লাহ এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, রাষ্ট্রপতিকে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাকে নিছক দলীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করা রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে।
সংকট নিরসনে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের ৩ দফা
এক. রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য—চিফ হুইপের এমন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করে সরকারকে স্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে যে, এই নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে আসন শূন্য হবে না।
দুই. রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যে সংসদের কার্যপ্রণালি নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র নির্বাচন এবং এতে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য নয়—ইসিকে অবিলম্বে এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
তিন. গণভোটের গণরায় অনুযায়ী ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞার পরিধি কেবল অর্থবিল ও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করতে হবে।
হাসনাত কাইয়ূম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সকল সংসদ সদস্যের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো নির্দিষ্ট দলের রাষ্ট্রপতি নয়, বরং প্রজাতন্ত্রের সর্বজনগ্রাহ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের স্বার্থে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের বিবেক ও স্বাধীন বিচারবোধ প্রয়োগ করে ভোট দিতে দলীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নিন।